<
অর্থনৈতিক সংকট
আগামী অক্টোবরে দেশটির জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় দেশটির রাজনীতিতে এখন ভোটের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনী প্রচারের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থেকে সরিয়ে দিতে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করতে চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছিলেন ইমরান খান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রচারে ক্ষমতাসীন দল ও সেনাবাহিনী তাকে সমান সুযোগ দিচ্ছে না।
গেল মার্চে নিজ বাসভবনের বাইরে একটি সমাবেশে তিনি বলেন, আমি ক্ষমতায় যাচ্ছি বলে সরকার ভীত। কারণ তারা জানে যে আমি তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসব। কারাগারে পাঠালেও নির্বাচনে আমি জয়ী হবো।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ২০১৯ সালে নেয়া সাড়ে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি সচল করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চুক্তি করতে চাচ্ছে পাকিস্তান সরকার। কিছু শর্ত পূরণ করতে না-পারায় গেল নভেম্বর থেকে এই অর্থনৈতিক কর্মসূচি স্থবির হয়ে আছে। কিন্তু পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে উঠতে হলে এই ঋণ খুবই দরকার।
এছাড়াও ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কিস্তি ছাড় দিতে বেশ কিছু শর্তজুড়ে দিয়েছে আইএমএফ। যাতে রুপি বিনিময় হার আরও উদার করার পাশাপাশি কর বাড়াতেও বলা হয়েছে। এসব শর্ত মানতে পাকিস্তান সরকার কতটা সফল হবে; তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
রেটিং সংস্থা মুডি বলছে, আইএমএফের অর্থছাড় না পেলে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে পাকিস্তান। কারণ জুনের পরে এটির বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আর থাকবে কি না; তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি বলছে, গত গ্রীষ্মে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। তাতে সেখানকার এক তৃতীয়াংশ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বন্যায় দেশটির তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এতে প্রায় চার হাজার কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে পাকিস্তান।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ক্রমাগত বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এক বছর আগের তুলনায় পাকিস্তানের ভোক্তামূল্য সূচক রেকর্ড পরিমাণ ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ফেব্রুয়ারিতে যেখানে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশ। মার্চে সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় খাদ্য, পানীয় ও পরিবহন খরচ বেড়েছে পঞ্চাশ শতাংশ। পাকিস্তানের প্রধান খাবার ময়দার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।
গ্যালাপ ও গিলানি পরিচালিত এক জরিপে দুই হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাদের তিন চতুর্থাংশ বলছে, গত ছয় মাসে পাকিস্তানের অর্থনীতির চরম অবনতি হয়েছে।
আরও পড়ুন: গ্রেফতারের আগে দেশবাসীকে যে বার্তা দেন ইমরান খান
গ্রেফতারে জনপ্রিয়তা বাড়বে ইমরানের
গ্রেফতার হওয়ার পর ক্রিকেট থেকে রাজনীতির মাঠে আসা ইমরান খানের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। পাকিস্তানের আইনজীবী আবদুল মইজ জাফরিও এমনটি মনে করছেন। ডন নিউজকে তিনি বলেন, এ গ্রেফতার ইমরান খানকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যাবে। এছাড়া আর কিছু হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার।
‘ক্ষমতাসীন সরকার ও তার অনির্বাচিত মিত্ররা মনে করেন, ইমরান খানকে পিটিআইয়ের বাইরে রাখতে পারলে তাদের ওপর থেকে চাপ কমে যাবে। তারা খুব সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারবেন। কারণ সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন পিটিআইপ্রধান,’ বলেন এই আইনজীবী।
কিন্তু এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই জানিয়ে আবদুল মইজ আরও বলেন, আমি মনে করি, সরকার ভুলে গেছে যে ইমরান খান বছরখানেক ধরে যেসব দাবি করে আসছেন, তার পেছনে বৈধ কারণও আছে।
মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্কের খবর বলছে, ইমরানকে ঘিরে যে নাটক তৈরি হচ্ছে, তাতে তার জনপ্রিয়তার পালে নতুন টাটকা হাওয়া লাগবে। পাকিস্তানে হরহামেশা রাজনৈতিক নেতাদের কোণঠাসা করার চক্রান্ত করা হচ্ছে। কিন্তু সেই চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে ইমরান খানের।
রাজনৈতিক মাঠে তার অবস্থান এতটাই শক্তিশালী যে, নানা ষড়যন্ত্র করে সরকার ও সেনাবাহিনী তাকে আটকাতে পারবে না বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
গেল গ্রীষ্মে পাঞ্জাব ও করাচিতে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করে পিটিআই। সাধারণত পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে পাঞ্জাব প্রদেশ। বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণেই ক্ষমতাসীনদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ।
কেউ কেউ বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর প্রভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন ভোটাররা। রাজনীতিতে তারা সামরিক বাহিনীর প্রভাব দেখতে চায় না। আর ইমরান খানের জনপ্রিয়তার জোয়ার এতই বেশি যে, রাজনীতিবিদদের কোণঠাসা করতে পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী কলাকৌশল ইমরান খানের ক্ষেত্রে কার্যকর না-ও হতে পারে।
ধরপাকড় চলছে বহু আগ থেকেই
সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই ইমরান খানের মিত্রদের ওপর ধরপাকড় শুরু হয়। এটি বছরখানেক আগের ঘটনা। তখন থেকেই যেসব সংবাদমাধ্যম ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তার পক্ষে সরব কিংবা সহানুভূতিশীল ছিলেন, ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের নীরব করিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আর তারা টেলিভিশন টকশোতে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। সাংবাদিকের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে, যাতে কেউ কথা বলতে না পারেন। ইমরান খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়।
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ইমরান খানের বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় এআরওয়াই নামের একটি মূলধারার চ্যানেল। কারণ এই চ্যানেলের এক টশোতে অংশ নিয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছিলেন ইমরানের এক সহযোগী।
এভাবে ইমরান খান ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে রাজনৈতিক শোডাউন চলছে। যার হারজিত দেখা যাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে। অভিযোগ করা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ইমরান খান। তখন বিরোধীরা দাবি করেছিলেন, ইমরানের খানের বিজয় নিশ্চিত করতে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভীতিপ্রদর্শন ও বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী তখন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে।
কিন্তু এরপর হঠাৎ করে দাবার গুটি উল্টে যায়। গেল বছরের শুরুর দিকে ইমরান খানের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় সেনাবাহিনী। আইনপ্রণেতাদের অনাস্থাভোটে পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান।
এরপরেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন এই ক্রিকেট কিংবদন্তি, পাকিস্তানের রাজনীতিতে যা একেবারেই বিরল ঘটনা। কারণ, সেখানে সেনাবাহিনীর ভীতিকর প্রভাব রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুখখোলার ঘটনা পাকিস্তানে খুব একটা দেখা যায় না।
]]>


