পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, নেপথ্যে কী? | চ্যানেল আই অনলাইন

পিএসসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, নেপথ্যে কী? | চ্যানেল আই অনলাইন

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ ঘিরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ অগাস্ট) দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া এই চেয়ারম্যান মেয়াদের অর্ধেকও পূর্ণ করার আগে কেন সরে দাঁড়ালেন এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন ড. মোবাশ্বের মোনেম। তবে পিএসসির কর্মকর্তাদের একাংশ বলছেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে তার শারীরিক অসুস্থতার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব ছিল না। বরং পদত্যাগের পেছনে আরও কিছু কারণ থাকতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে কমিশনের ভেতরে।

ড. মোবাশ্বের মোনেমের সময়ে পিএসসিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়। লক্ষ্য ছিল একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ ও নিয়োগের সুপারিশ পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করা।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একাধিক বিসিএসের জট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে এসব পরীক্ষায় ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা দ্রুত শেষ করে ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পিএসসির সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পদক্ষেপের ফলে একদিকে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমেছে, অন্যদিকে কমিশনের ওপর জমে থাকা প্রশাসনিক চাপও অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি বিসিএস ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার জট নিরসনের মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন চেয়ারম্যান।

এর পাশাপাশি প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পিএসসির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার দায়িত্বকালে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বা নিয়োগ-বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আসেনি।

তবে এসব সংস্কার উদ্যোগের পাশাপাশি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সামনে আনেন ড. মোবাশ্বের মোনেম। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পিএসসির সঙ্গে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল বলেও আলোচনা রয়েছে। এমনকি কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা চেয়ারম্যানের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন এমন কথাও পিএসসির ভেতরে শোনা যাচ্ছে।

পিএসসির এক কর্মকর্তা বলেন, চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় আলোচনায় রয়েছে। প্রথমত, তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে নির্বাচিত সরকার তাকে একই পদে রাখতে আগ্রহী নয় এমন বার্তা বিভিন্ন মহল থেকে তিনি পেয়ে থাকতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পিএসসির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন, সেটিও সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির কারণ হয়ে থাকতে পারে।

এর আগে গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন পিএসসি চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমকে পিএসসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

তার দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পরীক্ষার জট কমানো, সময়সীমাবদ্ধ পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগের কারণে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে পিএসসির প্রতি আস্থাও কিছুটা ফিরে আসে।

তবে পিএসসির সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, এসব সংস্কার উদ্যোগের কারণে স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী মহলের সঙ্গে চেয়ারম্যানের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল বলেও তারা মনে করেন। শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতিই তাকে পদত্যাগের দিকে ঠেলে দিয়েছে এমন ধারণাও রয়েছে তাদের মধ্যে।

ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ অবশ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট নয়। শারীরিক সমস্যার বিষয়টি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ থাকলেও পিএসসির ভেতরের আলোচনা বলছে, এর সঙ্গে প্রশাসনিক ও নীতিগত নানা বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একজন সংস্কারমুখী চেয়ারম্যানের সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় পিএসসির চলমান সংস্কার কার্যক্রম কতটা এগিয়ে যাবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ শুধু একজন চেয়ারম্যানের সরে দাঁড়ানোর ঘটনা নয়; সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পিএসসির স্বায়ত্তশাসন এবং চলমান সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়েও এটি নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।