পুলিশি হেনস্তা থামবে কবে? | চ্যানেল আই অনলাইন

পুলিশি হেনস্তা থামবে কবে? | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানের সঙ্গে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া পুলিশি মারধরের ঘটনাটি শুধু একজন ক্রিকেটারের হেনস্তার অভিযোগ নয়; এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। 

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনার মুখে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খুলশী পুলিশ জানিয়েছে, এরই মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিনজনকে খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের কেবল পোশাক, পদ বা বাহ্যিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির রূপান্তর।

যা ঘটেছিল

শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামে ফেরার পথে পুলিশের হাতে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১১টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফিরছিলেন তিনি। লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ অটোরিকশার গতিরোধ করে।

নাঈমের অভিযোগ, পুলিশ কোনো পরিচয় না দিয়েই তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলে এবং চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেয়। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক অন্য একটি সিএনজিতে তোলার চেষ্টা করা হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। তিনি জানতে চাইলে কেন তাকে এভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে, তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নাঈম দাবি করেন, ইউনিফর্ম পরা দুই পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন ব্যক্তিও তাকে মারধর করেন।

ঘটনার সময় তিনি বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করলে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন নাঈম। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে ঘটনাস্থলে শতাধিক মানুষ উপস্থিত হন। পরে অনেকেই তাকে চিনতে পেরে প্রতিবাদ জানান।

ঘটনার পর নাঈমের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এসআই ও কনস্টেবলের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের সোর্স আটক

জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানকে হেনস্তা ও মারধরের ঘটনায় পুলিশের সোর্স মোহাম্মদ সোহেলকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি তদন্তে একজন ডিসির নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। তদন্ত প্রতিবেদন পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে এ ঘটনায় খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেছেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

পরিচিত মুখও যদি রেহাই না পান?

এই হেনস্তার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জাতীয় দলের একজন পরিচিত ক্রিকেটার যদি পরিচয় দেওয়ার পরও এমন আচরণের শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কী?

বাংলাদেশে পুলিশি তল্লাশি বা অভিযানের নামে হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী এবং নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার, অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ এবং নাগরিকদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ দেখা যায়। অধিকাংশ ঘটনা আলোচনায় আসে না, কারণ ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতেও ভয় পান।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আইনের শাসনের মূল কথা হলো—প্রতিটি পদক্ষেপ আইন ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে গ্রহণ করা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের আগেই তাকে অপরাধীর মতো আচরণের শিকার করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের একটি অংশ নিজেদের জনগণের সেবক হিসেবে নয়, বরং জনগণের ওপর কর্তৃত্বকারী শক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

শুধু শাস্তি দিলেই কি সমাধান?

নাঈমের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিবার আলোচিত ঘটনা ঘটার পর কয়েকজন সদস্যকে প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করাই কি যথেষ্ট?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি মাঠপর্যায়ে মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার এবং পেশাগত আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ না করা হয়, তাহলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে পারে।

অধ্যাপক ড. উমর ফারুকের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের দায় নির্ধারণ করলেই যথেষ্ট হবে না; ঘটনার পেছনে কোনো নির্দেশনা, প্রভাব বা অন্য কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কার নির্দেশে বা কোন প্রেক্ষাপটে এমন আচরণ করা হয়েছে, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করা জরুরি। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আশরাফুল হুদা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভেতরে যে মানসিক চাপ ও ট্রমা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে এর মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় পুলিশের ইতিবাচক ভূমিকা ও সাফল্য রয়েছে, যা স্বীকার করতেই হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা। কোনো অবস্থাতেই একজন নাগরিককে এ ধরনের হেনস্তা বা অযাচিত বলপ্রয়োগের শিকার হতে হওয়া উচিত নয়। তাই ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন আচরণ করার সাহস না পায়।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, চোরাচালানের তথ্য ছিল অটোরিকশাটির বিরুদ্ধে। তবে এ তথ্য কতটুকু সঠিক যাচাই করা হচ্ছে। অভিযান চালানোর আগে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে কি না তা–ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযান কিংবা তল্লাশিতে পুলিশের কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।

কী করা জরুরি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে—অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত ও দোষী প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। থানাভিত্তিক জবাবদিহি ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মানবাধিকার ও নাগরিক আচরণবিষয়ক প্রশিক্ষণ জোরদার করা।

অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে পুলিশকে ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ফলে পুলিশের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।

সহমত প্রকাশ করে সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা বলেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন সদস্যদের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমানোও জরুরি। মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, কার্যকর তদারকি এবং পেশাগত মূল্যবোধ জোরদার করার মাধ্যমে একটি আরও মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর প্রতি আস্থা বজায় রাখতে শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নয়, বরং এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।