
মানচিত্রে জায়গাটি এত ছোট যে অনেকের চোখেই পড়ে না। অথচ কানাডার একেবারে গা ঘেঁষে রয়েছে ফ্রান্সের এক টুকরো ভূখণ্ড। নিউফাউন্ডল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূল থেকে সমুদ্রপথে মাত্র ২৫ কিলোমিটার এগোলেই আর কানাডা নয়, ফ্রান্স। উত্তর আটলান্টিকের বুকে ছোট্ট সেই ফরাসি ভূখণ্ডের নাম সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁ। ফরাসি পতাকা ওড়ে, ইউরো চলে, মানুষ কথা বলে ফরাসি ভাষায়। রোববার এই দ্বীপপুঞ্জেই মুখোমুখি হলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
কয়েক দিনের মধ্যেই দুজনের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা। সেখানে বৈঠক করা সহজ ছিল। কিন্তু তাঁরা বেছে নিলেন সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁকে। কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর এটাই সেখানে প্রথম সরকারি সফর। কার্নি ও ম্যাক্রোঁ দুজনেই মনে করিয়ে দিলেন, কানাডা ও ফ্রান্স শুধু আটলান্টিকের দুই পাড়ের বন্ধু নয়, এই দ্বীপপুঞ্জের কারণে তারা প্রতিবেশীও।
মধ্যাহ্নভোজের পর দুই নেতা গেলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবাহী একটি স্থানে। ১৯৪১ সালে সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁর বাসিন্দারা নাৎসি-সমর্থিত ভিশি সরকারের পরিবর্তে জেনারেল শার্ল দ্য গলের ফ্রি ফ্রান্সের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই সময়ের স্বেচ্ছাসেবকদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে একসঙ্গে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন কার্নি ও ম্যাক্রোঁ। পরে কার্নি বলেন, ইতিহাস তাঁদেরই মনে রাখে যারা নিজেদের নীতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দাঁড়ায়।
এরপর এলো সফরের সবচেয়ে বড় ঘোষণা। কানাডা ও ফ্রান্স যৌথ মহাকাশ অবকাঠামো তৈরি ও ভাগাভাগি করার কাজ শুরু করবে। দুই দেশের মহাকাশ সংস্থা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে কাজ এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে স্যাটেলাইট ও অন্যান্য মহাকাশযান উৎক্ষেপণের ব্যবস্থা এবং ভূমিতে এমন অবকাঠামো, যেখান থেকে স্যাটেলাইটের পাঠানো তথ্য গ্রহণ ও মহাকাশে থাকা যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
মহাকাশ এখন আর শুধু বিজ্ঞানী ও নভোচারীদের গবেষণার জায়গা নয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জাহাজ ও বিমানের চলাচল, টেলিযোগাযোগ, ইন্টারনেট, পৃথিবী ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, সামরিক যোগাযোগ এবং আর্কটিক অঞ্চলে তথ্য আদান-প্রদানের বড় অংশই এখন স্যাটেলাইটনির্ভর। ফলে উৎক্ষেপণ থেকে তথ্য গ্রহণ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকা একটি দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
কার্নি ও ম্যাক্রোঁর আলোচনা অবশ্য মহাকাশে থেমে থাকেনি। সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁ এবং আটলান্টিক কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সহযোগিতাকেও আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আঞ্চলিক যৌথ সহযোগিতা কমিশনকে অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য, জ্বালানি রূপান্তর, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় কাজ বাড়াতে বলা হয়েছে।
যৌথ বক্তব্যে ম্যাক্রোঁ মৎস্য, প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ নিয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেন। সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁর শিক্ষার্থীদের কানাডায়, বিশেষ করে মৎস্যসম্পর্কিত উচ্চশিক্ষায় আরও সুযোগ দেওয়ার কথাও উঠে আসে। পাশাপাশি দুই দেশের আবহাওয়া বিভাগের সহযোগিতা বাড়ানো এবং Canada-France Polar Research Forum গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিয়েও কথা হয়েছে দুই নেতার। আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে কানাডাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে দেখছে ফ্রান্স। ম্যাক্রোঁ বিশেষভাবে কানাডার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়াতে কানাডার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে চান তিনি। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, অ্যারোস্পেস, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দাবানল মোকাবিলায় দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াবে।
ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্স এবং ফ্রান্সের CCI France নতুন অংশীদারিত্ব শুরু করেছে। লক্ষ্য দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বিস্তৃত করা।
মহাকাশের সঙ্গে সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁর সম্পর্কও একেবারে নতুন নয়। দ্বীপপুঞ্জটিতে ইউরোপের গ্যালিলিও স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার একটি গ্রাউন্ড স্টেশন রয়েছে। অর্থাৎ মহাকাশ সহযোগিতার নতুন ঘোষণা এমন একটি দ্বীপে করা হলো, যেখানে ইউরোপের গ্যালিলিও স্যাটেলাইট ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড স্টেশন আগে থেকেই কাজ করছে।
ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে একের পর এক নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে কানাডা। ১৬ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম ‘associate member’ করার প্রস্তাব দেন। সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁতে দাঁড়িয়ে ম্যাক্রোঁ সেই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান। কার্নিও বলেন, ইউরোপের সঙ্গে কানাডার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ফ্রান্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রোববারের দিনটি এখানেই শেষ হয়নি। সাঁ-পিয়ের ও মিকেলোঁ থেকে অটোয়ায় ফিরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের সঙ্গে বৈঠকে বসেন কার্নি। সেখানেও আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল মহাকাশ। কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি ও নরওয়েজিয়ান স্পেস এজেন্সি গত মার্চে যে সমঝোতার কাজ শুরু করেছিল, সেটি এবার চূড়ান্ত হয়েছে। আর্কটিক ও উত্তরাঞ্চলের প্রয়োজন মাথায় রেখে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ, নেভিগেশন এবং অন্যান্য মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়াবে দুই দেশ।
বেসরকারি খাতেও কাজ এগোচ্ছে। নরওয়ের Kongsberg এবং কানাডার MDA Space মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি এবং আর্কটিকের সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার সমঝোতা করেছে।
এক দিনের ব্যবধানে নয়, একই দিনেই কানাডার মহাকাশ পরিকল্পনায় যুক্ত হলো ইউরোপের দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দুপুরে ফ্রান্সের সঙ্গে উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও স্যাটেলাইট অবকাঠামো নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত। সন্ধ্যায় নরওয়ের সঙ্গে আর্কটিক মহাকাশ সহযোগিতায় আরেক ধাপ অগ্রগতি। কেবল মহাকাশ নয়; আটলান্টিক, প্রশান্ত ও উত্তর মহাসাগর ঘেরা কানাডা জ্বালানি, প্রযুক্তি, আর্কটিক ও বাণিজ্যেও নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। একের পর এক নতুন উদ্যোগে দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধিও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: Office of the Prime Minister of Canada
