মহিন চরিত্রটিও আমার কাছে সেই ধরনের একটি সাহিত্যিক নির্মাণ। তিনি জীবনানন্দ নন, আবার জীবনানন্দ ছাড়া তার অস্তিত্বও নেই। তিনি কবির ‘আমি’ এবং ‘অন্য আমি’র মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতীকী সত্তা। এই ধারণাটিই চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
কিন্তু এখানে এসেই চিত্রনাট্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটিও চোখে পড়ে। চলচ্চিত্রটি তার দর্শকের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেনি।
যে দর্শকের জন্য এত প্রতীক, এত রূপক, এত পরাবাস্তব নির্মাণ, সেই দর্শককেই আবার সংলাপের মাধ্যমে বারবার বলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, কী বুঝতে হবে। বিশেষ করে মহিনের মুখে বারবার উচ্চারিত, ‘আমি এখনো জন্মাইনি’, কিংবা অনুরূপ ব্যাখ্যামূলক সংলাপগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়েছে, যেন চিত্রনাট্য নিজেই নিজের টীকা লিখছে।’
কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে কখনো নিজেকে ব্যাখ্যা করে না। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও আমি একই কথা বিশ্বাস করি।
একজন নির্মাতা যখন দর্শকের ওপর ভরসা করেন, তখন নীরবতাও কথা বলে। একটি অসম্পূর্ণ দৃশ্য, একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন কিংবা একটি প্রতীক অনেক সময় দীর্ঘ সংলাপের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বহন করে। বনলতা সেন ঠিক সেই জায়গায় আরও সাহসী হতে পারত।
বরং আমার মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রটি আরও অনেক নীরবতা দাবি করছিল।
এমন অসংখ্য দৃশ্য আছে, যেখানে সংলাপের বদলে শুধু মুখের অভিব্যক্তি, আলো, বাতাসের শব্দ কিংবা ক্যামেরার স্থিরতা যথেষ্ট ছিল। যখন সংলাপ কেবল তথ্য বহন করে, তখন তা চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষাকে দুর্বল করে দেয়। কারণ, চলচ্চিত্রের শক্তি তথ্যে নয়, অনুভূতিতে।
এই ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভিজ্যুয়াল নির্মাণ।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এত ধারাবাহিকভাবে পেইন্টিং-প্রভাবিত ফ্রেম আমি খুব কমই দেখেছি। প্রতিটি দৃশ্যে আলো ও অন্ধকারের বিন্যাস, রঙের সংযম, স্থাপত্যের ব্যবহার, পোশাক, লোকজ উপাদান এবং ফ্রেমের গভীরতা মিলে এমন এক নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে, যা আমাদের চলচ্চিত্রে বিরল। অনেক দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, যেন কোনো ধ্রুপদি ক্যানভাস ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছে।
এই চলচ্চিত্রে দৃশ্যগুলো কেবল গল্প বলে না, তারা নিজেরাও অর্থ তৈরি করে।




