‘বাবা, ভাত খেতে আসো তাড়াতাড়ি… কেউ বলবে না’ | চ্যানেল আই অনলাইন

‘বাবা, ভাত খেতে আসো তাড়াতাড়ি… কেউ বলবে না’ | চ্যানেল আই অনলাইন

দুপুরে দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে শেষবারের মতো ভাত খেয়েছিলেন সেকান্দার আলী। কে জানত, সেটিই হবে দুই সন্তানের সঙ্গে তার শেষ খাবার। পরদিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারান তার দুই ছেলে মো. মনসুর ও মো. নাসির। একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে এখন শোকে পাগলপ্রায় বৃদ্ধ বাবা।

চট্টগ্রামের স্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর প্রতিবেদনে বলা হয়, শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে দুই ছেলে প্রাণ হারানোর পর দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই বাবা। আর বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে তার তিন নাতনি।

শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে একটি পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ১০ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে সেকান্দার আলীর দুই ছেলে মনসুর ও নাসিরও রয়েছেন।

দুই ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই দিশেহারা সেকান্দার আলী। মর্গে পাশাপাশি রাখা দুই সন্তানের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার কাঁদছিলেন তিনি। তাঁর পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন নাতনিরাও। নিহত নাসিরের এক মেয়ে এবং মনসুরের দুই মেয়ে এখন বাবাকে হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায়।

চট্টগ্রামে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারান মো. মনসুর ও মো. নাসির

কাঁদতে কাঁদতে সেকান্দার আলী বলেন, ১৭ বছর ধরে আমার দুই ছেলে ওই শিপইয়ার্ডে কাজ করেছে। কোনো দিন কোনো বিপদ হয়নি। এখন আমাকে একসঙ্গে দুই ছেলেকে হারাতে হলো। আর কোনো দিন আমার সন্তানরা বাবা বলে ডাকবে না। বাবা, ভাত খেতে আসো তাড়াতাড়ি, এই কথাও কেউ বলবে না।

তিনি বলেন, এখন আমার নাতনিদের কে দেখবে, তাদের কী হবে, এই চিন্তাই আমাকে অস্থির করে তুলছে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই আমাকে দুই ছেলেকে হারাতে হলো। আহতদের সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হলে হয়তো তাদের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।

নিহত মনসুরের বড় মেয়ে রুপা আক্তার বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা থাকলেও তার বাবাকে জোর করে কাজে নেওয়া হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর আহতদের প্রায় দুই ঘণ্টা ইয়ার্ডের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রুপা বলেন, সকালে দ্রুত চিকিৎসা পেলে হয়তো বাবা বেঁচে যেতেন। এখন আমাদের কে দেখবে? কীভাবে চলব আমরা? আমরা তিন বোন, আমাদের কোনো ভাই নেই। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন বাবা।

দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজন ও এলাকাবাসীর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্থানীয়রা জানান, মনসুর ও নাসির দুজনই এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

শিপইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।