
বিশ্বকাপের মাঠে যখন ছোট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে নিজের পতাকা উড়িয়ে দাঁড়ায়, যখন Curaçao-এর মতো ক্ষুদ্র ভূখণ্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে জায়গা করে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ভারত কোথায়? চীন কোথায়? পৃথিবীর দুই বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ, দুই বিশাল অর্থনীতি, দুই প্রাচীন সভ্যতা। অথচ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে তাদের কোনো জায়গা নেই। কেন? উত্তরটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই জটিল।
বিশ্বকাপ এলে কলকাতার অলিগলি, কেরালার চায়ের দোকান কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি শহরগুলো ফুটবলের রঙে বদলে যায়। কোথাও আর্জেন্টিনার পতাকা, কোথাও ব্রাজিলের জার্সি, কোথাও মেসি-রোনালদোর ছবি। অথচ সেই ভারতের জাতীয় দল বিশ্বকাপের মাঠে নেই।
চীনের ছবিও কম বিস্ময়কর নয়। যে দেশ অলিম্পিকে পদকের পাহাড় গড়ে, যে দেশ ক্রীড়াকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ করে, যে দেশ স্টেডিয়াম বানাতে পারে শহরের মতো বিশাল, সেই চীনও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নেই।
বিশ্বকাপ কাউকে জনসংখ্যা দেখে নেয় না। অর্থনীতি দেখে নেয় না। বিশ্বকাপে জায়গা পেতে হলে শেষ পর্যন্ত মাঠেই জিততে হয়। ভারত ও চীন সেই কঠিন পরীক্ষায় বারবার পিছিয়ে পড়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। এবার ৪৮টি দল খেলছে। এশিয়ার জন্য সুযোগও আগের চেয়ে বেড়েছে। তবুও ভারত ও চীন নেই। এর অর্থ, সমস্যা শুধু সুযোগের অভাবে নয়; সমস্যা আরও গভীরে।
ভারতের ফুটবল-গল্পে এক অদ্ভুত আক্ষেপ আছে। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে ভারত খেলার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে একটি জনপ্রিয় গল্প চালু আছে, ভারত নাকি খালি পায়ে খেলতে চেয়েছিল বলে বিশ্বকাপে যায়নি। বাস্তবতা ছিল খরচ, প্রস্তুতির অভাব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসহ নানা কারণ মিলে ভারত সেই সুযোগ হাতছাড়া করে। ইতিহাসে কিছু সুযোগ হারিয়ে যায়, আবার কিছু সুযোগ ইতিহাসেরই অংশ হয়ে যায়। ভারতের ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ সেই রকমই এক না-খেলা ইতিহাস।
তারপর কেটে গেছে সাত দশকের বেশি সময়। ভারত আর বিশ্বকাপের মূলপর্বে ফিরতে পারেনি। অথচ এই দেশ ফুটবলবিমুখ নয়। কলকাতার ময়দান বহু যুগ ধরে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল আবেগের এক বড় ঠিকানা। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের ডার্বি শুধু কলকাতার ফুটবল-উৎসব নয়; এটি ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়গুলোর একটি। চুনী গোস্বামী, পি কে ব্যানার্জি, তুলসীদাস বলরাম, শৈলেন মান্না থেকে শুরু করে বাইচুং ভুটিয়া, আই এম বিজয়ন, সুনীল ছেত্রী, ভারতের ফুটবল অনেক নায়ক দেখেছে। কিন্তু কিংবদন্তি ফুটবলার তৈরি আর বিশ্বকাপে ওঠার পথ এক নয়।
ভারতের প্রধান বাস্তবতা হলো, দেশটি ক্রিকেটকেন্দ্রিক। ফুটবল দেখা হয়, ফুটবল নিয়ে তর্ক হয়, মেসি-রোনালদোর নামে শিশুরা জার্সি পরে, কিন্তু ফুটবল এখনও জাতীয় ক্রীড়া-অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে আসতে পারেনি। ভারতের ব্যর্থতা প্রতিভার অভাবে নয়; ঘাটতি মূলত কাঠামোয়। আন্তর্জাতিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলতে পারে, এমন ফুটবলার তৈরির ধারাবাহিক ব্যবস্থাই এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভারত দ্বিতীয় রাউন্ডও পেরোতে পারেনি। একটি দেশ যত বড়ই হোক, বাছাইপর্বের টেবিলে পয়েন্ট না পেলে বিশ্বকাপের দরজা খুলে না।
চীনের গল্প ভিন্ন, কিন্তু ফল একই। চীন ফুটবলে একসময় বিপুল অর্থ ঢেলেছিল। বড় ক্লাব, বিদেশি তারকা, নামি কোচ, ফুটবল স্কুল, সরকারি পরিকল্পনা, সবই ছিল। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তারকা ফুটবলার এনে চীনা সুপার লিগকে আলোয় ভরিয়ে তোলা হয়েছিল। এমনকি একসময় চীনের স্বপ্ন ছিল বিশ্বকাপে শুধু খেলা নয়, একদিন বিশ্বকাপ আয়োজন ও জেতা। কিন্তু অর্থ দিয়ে স্টেডিয়াম বানানো যায়, ফুটবল সংস্কৃতি রাতারাতি বানানো যায় না।
চীন একবারই বিশ্বকাপ খেলেছে, ২০০২ সালে। সেই আসরে তারা কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি, একটি গোলও করতে পারেনি। ২০০২ সালে একবার যে দরজাটি খুলেছিল, সেটি আর কখনও খোলেনি। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, চীন আর বিশ্বকাপের মূলপর্বে ফিরতে পারেনি। যে দেশ অলিম্পিকে সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস, টেবিল টেনিস, ডাইভিংয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়, সেই দেশ ফুটবলে বারবার থমকে যায়।
ফুটবল শুধু খেলোয়াড়ের খেলা নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। একটি শিশুর পায়ে বল ধরার জায়গা থাকতে হয়, স্কুল ফুটবল থাকতে হয়, ক্লাব কাঠামো থাকতে হয়, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা থাকতে হয়, প্রশিক্ষক তৈরি করতে হয়, স্থানীয় লিগকে শক্তিশালী করতে হয়। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ক্রোয়েশিয়া কিংবা উরুগুয়ের সাফল্যের পেছনে এই দীর্ঘ ফুটবল সংস্কৃতি আছে। সেখানে ফুটবল শুধু ম্যাচের দিন শুরু হয় না; পাড়ার মাঠ, স্কুল, একাডেমি, ক্লাব ও পরিবারের ভেতর দিয়ে বহু বছর ধরে তৈরি হয়।
ভারত ও চীনের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতার অভাব। এশিয়ায় এখন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, উজবেকিস্তান, কাতার, ইরাক, জর্ডানের মতো দল নিয়মিত উন্নতি করছে। তারা শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করছে না; আধুনিক কোচিং, স্পোর্টস সায়েন্স, ইউরোপীয় ক্লাবে খেলোয়াড় পাঠানো, বয়সভিত্তিক দল গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর ভর করছে। ভারত ও চীন এই দৌড়ে এখনও পিছিয়ে।
তবে আশার কথা, ভারতীয় ফুটবলে নতুন প্রজন্ম আসছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের খেলোয়াড়রা উঠে আসছে, আইএসএল ধীরে ধীরে পেশাদার কাঠামো তৈরি করছে। চীনও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছে।
বিশ্বকাপ প্রস্তুতির প্রতিযোগিতা। সেখানে জনসংখ্যা মাঠে নামে না, নামে এগারো জন ফুটবলার। অর্থনীতি গোল করে না, গোল করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি ফুটবল সংস্কৃতি। ভারত ও চীনের কোটি সমর্থকের বিশ্বাস, একদিন তাদের দেশও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরবে। তবে সেই দিনটি আসবে শুধু স্বপ্নে নয়, পরিকল্পনায়; শুধু বিনিয়োগে নয়, প্রতিভা লালনের দীর্ঘ যাত্রায়।
তথ্যসূত্র:
FIFA; Reuters; Le Monde; ESPN






