একটি জাহাজে কতজন মানুষ থাকে? পাঁচজন, দশজন কিংবা তারও বেশি। কিন্তু একটি সমাজে? সেখানে থাকে অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য সম্পর্ক, অসংখ্য ক্ষমতার স্তর। কেউ নির্দেশ দেয়, কেউ তা পালন করে। কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে। কেউ নিপীড়ন করে, কেউ সহ্য করে। আবার কেউ এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে মানবিকতাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
মোহাম্মদ নূরুজ্জামান পরিচালিত ‘মাস্তুল’ আমার কাছে সেই সমাজেরই একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।
সিনেমাটি শুরু হয় নদীর বুকে ভাসমান একটি তেলবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে। যেখানে কাজ করে মকবুল,মাস্টার, সুকানিসহ বেশ কয়েকজন। এই জাহাজের চরিত্রগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় এটি কেবল একটি কর্মস্থল নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্র, একটি শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজ, যেখানে প্রতিটি মানুষ একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে। আর সেই ভূমিকাগুলোর মধ্যেই পরিচালক অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ক্ষমতা, বৈষম্য, নীরবতা এবং মানবিকতার জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
চলচ্চিত্রের নাম ‘মাস্তুল’। নাম শুনেই মনে হবে কেবল জাহাজের একটি অংশের নাম। কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর মনে হবে, এই নামটি নিছক একটি প্রযুক্তিগত শব্দ নয়, বরং চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় রূপক। সোজাভাবে বলতে গেলে জাহাজ বা নৌকায় মাস্তুলের কাজ ঝড়ের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা, ভারসাম্য রক্ষা করা। সে একা মাথা উচু করে আকাশের দিকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে অথচ জাহাজের গন্তব্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা তার নেই। সমাজেও এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের শ্রম ছাড়া সভ্যতা এগোতে পারে না, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের হাতে থাকে না। মকবুল চরিত্রটি সেই মানুষদেরই প্রতিনিধি।
তবে মাস্তুল শুধু মকবুলের গল্প নয়। বরং সিনেমার প্রতিটি চরিত্রই অন্য আরেকটি চরিত্রের মাধ্যমে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন মকবুলকে বুঝতে হলে সুকানিকে বুঝতে হয়। সুকানিকে বুঝতে হলে মাস্টারের নীরবতাকে বুঝতে হয়। আবার নূরা না থাকলে মানুষের আবেগ, ভালোবাসার জায়গায় খামতি থেকে যায়। অর্থাৎ আমার কাছে ‘মাস্তুল’ মূলত একটি চরিত্রনির্ভর চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি সম্পর্কনির্ভর চলচ্চিত্র। এখানে মানুষকে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। কারণ প্রতিটি সম্পর্কই ক্ষমতার একটি মানচিত্র তৈরি করে।
মকবুল এই মানচিত্রের সবচেয়ে নিচের স্তরে অবস্থান করে। সে শ্রম দেয়, দায়িত্ব পালন করে, কিন্তু সম্মান পায় না। তার উপস্থিতি প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার অনুভূতি অপ্রয়োজনীয়। এই বাস্তবতা শুধু মকবুলের নয়, আমাদের সমাজের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষেরও। কিন্তু মকবুলের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নীরবতা। সে খুব কম কথা বলে। প্রথমে মনে হতে পারে, এটি তার ব্যক্তিগত স্বভাব। কিন্তু চলচ্চিত্রটি যত এগোয়, ততই মনে হয় এই নীরবতা আসলে সমাজের তৈরি। দীর্ঘদিন ধরে অপমান, শ্রেণিবৈষম্য ও অবহেলার মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষ একসময় নিজের কণ্ঠস্বরের ওপরই আস্থা হারিয়ে ফেলে। তখন সে চুপ করে যায়। কারণ সে জানে, তার কথা শোনার কেউ নেই। মুখের ভাষা হারালেও মানুষ কখনও সম্পূর্ণ ভাষাহীন হয় না।
সেই কারণেই মকবুলের ভাষা খুঁজতে হলে আমাদের তার সংলাপে নয়, তার আচরণের দিকে তাকাতে হবে। খুব অল্প সংলাপ নিয়েও ফজলুর রহমান বাবু মকবুলকে এমন এক গভীরতা দিয়েছেন, যেখানে নীরবতাই চরিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী সংলাপে পরিণত হয়েছে। তার নদীতে কয়েন ছুড়ে দেওয়ার দৃশ্যটি আমার কাছে চলচ্চিত্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই দৃশ্যের রিপিটেশনের মত তার একাধিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, যে মানুষ নিজের দুঃখ বা আনন্দ কারো কাছে বলতে পারে না, তখন সে প্রকৃতিকেই নিজের শ্রোতা বানায়। নদী তখন আর কেবল জলরাশি থাকে না হয়ে ওঠে তার নীরব স্বীকারোক্তির স্থান। প্রতিটি কয়েন যেন একটি না-বলা কথা, একটি অপমানের স্মৃতি, কিংবা বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস যা সে তার বয়সের সাথে বিসর্জন দেয় নদীতে কিংবা জমা রাখে নদীর গর্ভে অথবা বাশির সুরে মিলিয়ে দেয় হাওয়ায়।
আবার কোনো সমাজে নিপীড়িত মানুষকে বুঝতে হলে শুধু তার দিকে তাকালেই হয় না, যে তাকে প্রতিনিয়ত নিপিড়ন করে, তার দিকেও তাকাতে হয়। কারণ ক্ষমতা কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে নয়, মানুষের দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়েও কাজ করে।
এই জায়গায় এসে সুকানি (দীপক সুমন) চরিত্রটি চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে উঠে আসে। প্রথম দর্শনে তাকে একজন নিষ্ঠুর মানুষ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, সে কেবল একজন ব্যক্তি নয়, সে এমন এক মানসিকতার প্রতিনিধি, যেখানে শ্রেণিগত শ্রেষ্ঠত্বকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। মকবুলকে তার অপমান করার ভঙ্গি, তাকে মানুষ হিসেবে নয় বরং ক্ষমতার নিচু স্তরের একজন কর্মী হিসেবে দেখার অভ্যাস, তার উচ্চকণ্ঠ, নিষ্ঠুর আচরণ, উচ্চাকাঙ্খা, ক্ষমতার প্রয়োগ, দ্বিচারিতা সবকিছুই ক্ষমতার প্রতিদিনের চর্চা।
তবে সুকানিকে কেবল খলচরিত্র হিসেবে দেখলে চলচ্চিত্রটির গভীরতা কমে যাবে। কারণ পরিচালক তাকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যেখানে তার নিষ্ঠুরতা ব্যক্তিগত রাগের চেয়ে একটি সামাজিক অভ্যাস বলে মনে হয়। যেন সে নিজেও এমন এক ব্যবস্থার অংশ, যেখানে কর্তৃত্ব মানেই কঠোরতা, আর মানবিকতা যেন দুর্বলতার আরেক নাম।
সুকানির পোষা কবুতরটি আমার কাছে এই চরিত্রকে বোঝার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসংগ। কবুতরটি দিয়ে বোঝা যায় সুকানির কাছে সম্পর্ক স্নেহের নয়, কর্তৃত্বের। ভালোবাসার নয়, মালিকানার। ফলে কবুতরটি কেবল একটি পোষা প্রাণী থাকে না, এটি ক্ষমতার মনস্তত্ত্বের এক নীরব প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে মাস্টার চরিত্রটি। তার অবস্থান সুকানির চেয়ে উঁচু হলেও তার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিক দায়বদ্ধতার মিল আমরা খুব একটা দেখি না। তিনি অন্যায় দেখেন, অপমান দেখেন, বৈষম্য দেখেন, তবুও অধিকাংশ সময় নীরব থাকেন। এই নীরবতা আমাকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে। কারণ সমাজে অনেক সময় অন্যায় শুধু অত্যাচারীর জন্য টিকে থাকে না, টিকে থাকে সেইসব মানুষের কারণেও, যারা অন্যায়কে দেখে, বোঝে, কিন্তু নিজের স্বস্তির জন্য মুখ বন্ধ রাখে।
তবে পরিচালক এখানেই থেমে থাকেন না। তিনি একই কাঠামোর ভেতর লস্কর চরিত্রটিকেও নিয়ে আসেন। সুকানির অনুপস্থিতিতে জাহাজের দায়িত্ব নেওয়া, কবুতরের দেখাশোনা করা, সব মিলিয়ে লস্করও ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করে। কিন্তু তার আচরণে আমরা সুকানির নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি দেখি না বরং তার মধ্যে এক ধরনের সংযম ও মানবিকতা আছে। এই চরিত্রটি যেন মনে করিয়ে দেয়, একই অবস্থানে থেকেও সবাই একই রকম হয় না। ক্ষমতা মানুষকে বদলে দিতে পারে, কিন্তু মানুষ চাইলে ক্ষমতার ভাষাকে অস্বীকারও করতে পারে। লস্কর (সিকদার মুকিত) সেই সম্ভাবনার নাম।
এবার আসি নূরার (আনাইরা) কাছে। এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে নৈতিকভাবে দৃঢ় চরিত্র নূরা। সে মকবুলকে যে সম্পর্কের মায়ায় বাঁধতে চায় তা মানবিকতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। যেখানে মানুষের পরিচয় তার শ্রেণি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে মানসিক শক্তি এবং সাহস তার সামাজিক অবস্থানকে ছাপিয়ে যায়।
চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দেখা যায় নূরা মকবুলের মত নদীতে পয়সা ফেলছে। এখানেই পরিচালক হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন নূরার পরিণতি কোন একক চরিত্রের পরিণতি নয়, বরং একটি সমাজ ব্যবস্থার স্থায়িত্বের গল্প। যেখানে অন্যায় কেবল একজন মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন সুকানি চলে গেলে আরেকজন আসতে পারে, একজন মকবুল হারিয়ে গেলে তার জায়গায় আরেকজন শ্রমজীবী মানুষ এসে দাঁড়ায়। কিন্তু কাঠামোটি একই থাকে। মানুষ যখন বছরের পর বছর বৈষম্য, অপমান ও নীরবতার মধ্যে বাস করতে থাকে, তখন একসময় সে প্রতিবাদ করার ভাষা হারিয়ে ফেলে। আরও ভয়ংকর হলো পরবর্তী প্রজন্ম সেই নীরবতাকেই স্বাভাবিক জীবন বলে মেনে নিতে শেখে। অন্যায় তখন আর কেবল একটি ঘটনা থাকে না, তা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
তবু পরিচালক আমাদের সম্পূর্ণ আশাহত করেন না। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে মকবুলের নদীর কাছে আত্মসমর্পণ, তার বাঁশির সুর, নূরার মানবিক উপস্থিতি কিংবা লস্করের সংযত আচরণ বারবার মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার কাঠামো যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের ভেতরের মানবিকতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায় না। সেই ক্ষীণ আলোই হয়তো পরিবর্তনের একমাত্র সম্ভাবনা।






