
১৯৭১। একটি ছোট্ট ট্রানজিস্টর রেডিও তখন কেবল সংবাদ কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের এক শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের কোটি মানুষ- আশা, সাহস, খবর আর প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছিল রেডিওর তরঙ্গ!
সেই ইতিহাস, সেইসব মানুষের স্মৃতি এবং একাত্তরে আকাশবাণী কলকাতা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উঠে এসেছে তথ্যচিত্র ‘মুক্তির তরঙ্গ’-এ।
কলকাতার সুকৃতী ফাউন্ডেশনের নিবেদনে নির্মিত এই তথ্যচিত্রটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত। উপস্থাপনায় রয়েছেন ভবেশ দাশ এবং ধারাভাষ্যে শুভমিতা মুখার্জী। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে থাকা আকাশবাণী কলকাতাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্রটি।
বড়পর্দায় প্রদর্শনীর পর শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নিজের ইউটিউবে এটি প্রকাশ করেছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত। ‘মুক্তির তরঙ্গ’ তথ্যচিত্রটির ট্যাগ লাইন ‘যে বেতার বদলে দিয়েছিলো এক যুদ্ধ’। নামের মধ্যেই যেন ধরা আছে তথ্যচিত্রটির মূল বক্তব্য।
একাত্তরে রেডিও কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো একটি মাধ্যম থেকে স্বাধীনতার লড়াইয়ের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল- সেটি ৪৩ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত।
তথ্যচিত্রে মনোরঞ্জন ঘোষাল, জগন্নাথ বোস, শঙ্কর দাশগুপ্ত, পঙ্কজ সাহা ও উপেন তরফদারের সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সময় রেডিওর ভূমিকার নানা অধ্যায়। সেই সময় কারা কীভাবে কাজ করেছেন, কীভাবে সংবাদ ও অনুষ্ঠান তৈরি হয়েছে, কীভাবে তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছেছে- সেসব ঘটনাও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে উঠে এসেছে তাঁদের স্মৃতিচারণে।
নির্মাতা অভিজিৎ দাশগুপ্ত নিজেও ১৯৭১ সালে যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। তাঁর ভাষ্যে, যুদ্ধের সময় আকাশবাণী কলকাতা ছিল বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও আশার আলো ও লড়াইয়ের জ্বালানি। সেই ঐতিহাসিক অথচ কিছুটা বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার তাগিদ থেকেই এই তথ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ।
অভিজিৎ দাশগুপ্তের মতে, একাত্তরে আকাশবাণী কলকাতা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য মেলবন্ধন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি গোপন বাড়ি থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম চলত। অন্যদিকে আকাশবাণী কলকাতা শুধু কারিগরি সহায়তাই দেয়নি, স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান ও সংবাদকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই দুই বেতারের সম্মিলিত প্রতিরোধকেই নির্মাতা অভিহিত করেছেন ‘মুক্তির তরঙ্গ’ হিসেবে।
একাত্তরের সেই রেডিওযুদ্ধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’। এম আর আখতার মুকুলের কণ্ঠে প্রচারিত ‘চরমপত্র’ যেমন অবরুদ্ধ মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছিল, তেমনি আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠও হয়ে উঠেছিল যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের মানুষের পরিচিত ও প্রত্যাশিত এক কণ্ঠস্বর। তথ্যচিত্রে তাঁদের পাশাপাশি পঙ্কজ কুমার মল্লিকসহ বিভিন্ন শিল্পী ও কলাকুশলীর স্টুডিওর ভেতরে দিন-রাত কাজ করে যাওয়ার স্মৃতিও উঠে এসেছে।
‘মুক্তির তরঙ্গ’-এর বিশেষত্ব শুধু রেডিওর ইতিহাস তুলে ধরায় নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে নির্মাতার ব্যক্তিগত স্মৃতিও। ১৯৭১ সালে তরুণ বয়সে নিজের চোখে দেখা একটি দেশের জন্ম এবং সেই জন্মপ্রক্রিয়ায় রেডিওর ভূমিকা—এই দুই অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণেই তথ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত।
অভিজিৎ দাশগুপ্তের ভাষায়, এই নিবেদন সেই অগণিত বেতারকর্মী, শিল্পী, কলাকুশলী এবং লক্ষ লক্ষ নামহীন শ্রোতার প্রতি, যাঁদের কণ্ঠ, সাহস ও বিশ্বাস রেডিওকে করে তুলেছিল মুক্তির অস্ত্র। সেই অর্থে ‘মুক্তির তরঙ্গ’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্ব বেতার ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
