
ওয়াশিংটন, ০১ নভেম্বর – যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ায় (Nvidia) কর্মরত বিশিষ্ট বাংলাদেশি এআই (AI) গবেষক ইরফান আল হুসাইনির (৩২) করুণ ও রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। এবার এই তরুণ বিজ্ঞানীর মৃত্যুর নেপথ্য কারণ ও পারিপার্শ্বিক জটিলতা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ (The Wall Street Journal)।
গত ৩১ অক্টোবর দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে সাংবাদিক জুশা এলিনসন রচিত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে— ‘দ্য সাডেন ডেথ অব অ্যান এনভিডিয়া এআই প্রডিজি লিভস বিহাইন্ড বিটার অ্যাকিউজেশনস’ (এনভিডিয়ার এক এআই বিষ্ময়-বালকের আকস্মিক মৃত্যু এবং পেছনে ফেলে যাওয়া তিক্ত অভিযোগ)।
জর্জিয়া টেকের ‘আইডিয়াল কাপল’ থেকে সিলিকন ভ্যালির উজ্জ্বল তারকা
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ‘জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (জর্জিয়া টেক) তাদের দুই সফল শিক্ষার্থী—ইরফান আল হুসাইনি ও তার স্ত্রী ফাবিয়া ফারলিন অ্যাথেনার সাফল্য ও রোমান্টিক জীবনের গল্প নিজেদের অফিসিয়াল মিডিয়াতে তুলে ধরেছিল।
পেশাগত সফলতা: দুজনেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় একাধিক সম্মানজনক পুরস্কার লাভ করেন।
সিলিকন ভ্যালিতে পাড়ি: ডক্টরেট শেষে তারা দুজনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন। ফাবিয়া যুক্ত হন বিশ্বখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর ইরফান যোগ দেন চিপ প্রস্তুতকারক পরাশক্তি এনভিডিয়ায়।
বিশাল অর্জন ও আয়: ফাবিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিদ্যুৎ ও শক্তি খরচ কমানোর গবেষণার জন্য ২০২৫ সালে সাময়িকী ফোর্বসের সম্মানজনক ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’ (Forbes 30 Under 30) তালিকায় স্থান পান। অপরদিকে, এনভিডিয়ায় জ্যেষ্ঠ তথ্যবিজ্ঞানী (Senior Data Scientist) হিসেবে দ্রুত পদোন্নতি পান ইরফান। বোনাস, বেতন ও শেয়ার সুবিধা মিলিয়ে ইরফানের বার্ষিক আয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫ লাখ মার্কিন ডলারে।
ঘরের ভেতর ঝুলন্ত লাশ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এমন অভাবনীয় পেশাগত সাফল্যের মধ্যেই ২০২৬ সালের ২২ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে নিজেদের যৌথ বাসস্থান থেকে ঝুলন্ত ও সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ইরফানকে। টানা ৮ দিন হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যুর কাছে হার মানেন এই তরুণ প্রযুক্তিবিদ।
স্থানীয় ক্যালিফোর্নিয়া পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শেষে ঘটনাটিকে অপরাধমুক্ত হিসেবে বর্ণনা করে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেয়। তবে পুলিশের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং তদন্তের গভীরতা নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন ইরফানের পরিবার, সহপাঠী ও সমর্থকেরা।
বুয়েট থেকে যুক্তরাষ্ট্র: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে দাবানল
পুলিশের তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সহকর্মীরা দফায় দফায় ব্যাপক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন।
গত আগস্টে ইরফানের আলমা ম্যাটার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে এক বিশাল বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের আয়োজন করেন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক স্বাধীন কোনো সংস্থাকে দিয়ে এই মৃত্যুর নিরপেক্ষ বিচার ও তদন্ত সুনিশ্চিত করতে হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এখন সেই বিচার পাওয়ার দাবিকে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালো করে তুলল।
এনএন/ ০১ নভেম্বর ২০২৬




