যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে শান্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের সুমহান আদর্শ – DesheBideshe

যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বে শান্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের সুমহান আদর্শ – DesheBideshe

রিয়াদ, ১৫ মার্চ – মানবসভ্যতার ইতিহাসে সংঘাত বা যুদ্ধ নতুন কোনো বিষয় নয়। যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি ও রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ এবং আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে যুদ্ধ মানে কেবল দুটি সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ সংঘর্ষ নয়।

এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু, ভয়াবহ শরণার্থী সংকট, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও চরম মানবিক বিপর্যয়। শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ যারা যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, তাদের জীবনই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে। এমন এক অস্থির ও যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে ইসলাম মানবজাতির সামনে ন্যায়, সংযম ও মানবতার এক অনন্য এবং সুশৃঙ্খল নীতিমালা উপস্থাপন করেছে। ইসলাম মূলত শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত।

ইসলাম শব্দটির মূল অর্থের মধ্যেই শান্তি ও আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে। তাই ইসলাম কখনোই যুদ্ধকে প্রাথমিক উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করেনি। বরং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অত্যাচার প্রতিরোধ এবং আত্মরক্ষার শেষ উপায় হিসেবে যুদ্ধকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, তবে সীমালঙ্ঘন করো না, কারণ আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ইসলামে যুদ্ধের অনুমতি থাকলেও তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত এবং ন্যায়ভিত্তিক। এখানে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো সাধারণ মানুষের প্রাণহানি।

অত্যাধুনিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিমেষেই শহর, হাসপাতাল এবং বিদ্যালয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অথচ ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য এবং একজনকে জীবন দান করা সমগ্র মানবজাতিকে জীবন দান করার সমান। ইসলাম যুদ্ধের সময়ও কঠোর নৈতিক বিধান পালনের নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের যুদ্ধের ময়দানে পাঠানোর আগে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিতেন যে, কোনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং ইবাদতে মগ্ন ধর্মযাজককে হত্যা করা যাবে না।

এছাড়া গাছপালা ধ্বংস করা, কৃষিজমি পুড়িয়ে দেওয়া এবং অকারণে ঘরবাড়ি ধ্বংস করার ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। আজকের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন যেসব নীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, ইসলাম চৌদ্দ শত বছর আগেই তার সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আজ বহু মানুষ দখলদারিত্ব ও নিপীড়নের শিকার। ইসলাম সব সময় মজলুম বা অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে উৎসাহ দেয়।

সুরা নিসার ৭৫ নম্বর আয়াতে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে সংঘাতের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে ইসলাম যুদ্ধকে নয়, বরং শান্তি ও সংলাপকেই অগ্রাধিকার দেয়। সুরা আনফালের ৬১ নম্বর আয়াতে শত্রুরা শান্তির দিকে অগ্রসর হলে মুসলমানদেরও শান্তির পথে হাঁটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) প্রতিশোধের পরিবর্তে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। একইভাবে জেরুজালেম বিজয়ের সময় সালাহউদ্দিন আইয়ুবী খ্রিস্টানদের নিরাপদে শহর ত্যাগের সুযোগ দিয়ে মানবিকতার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন।

বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে মানুষের জীবন, সম্মান ও স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের এই চিরায়ত মূল্যবোধগুলো পুনরায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই পৃথিবীতে এসব মানবিক শিক্ষা শুধু কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।

এ এম/ ১৫ মার্চ ২০২৬