যে ১০ কারণে আত্মার মৃত্যু হয়

যে ১০ কারণে আত্মার মৃত্যু হয়

ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) ছিলেন বলখের বিখ্যাত বুজুর্গ ও আত্মশুদ্ধির পথিকৃৎ। দ্বিতীয় হিজরি শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। পার্থিব ভোগ-বিলাস ও সম্ভ্রান্ত জীবন ত্যাগ করে তিনি ধর্মের পথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেছিলেন।

তাবেয়ি যুগের বহু আলেম ও মুহাদ্দিসের সান্নিধ্য লাভ করেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ইবাদত এবং হৃদয়স্পর্শী নসিহার জন্য মুসলিম সমাজে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল।

ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বসরার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় একদল লোক করলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, কিন্তু আমাদের দোয়া কবুল হয় না কেন?’

তিনি বললেন, ‘১০ কারণে তোমাদের হৃদয়ের মৃত্যু হয়েছে, এজন্য দোয়া কবুল হয় না।’ এরপর তিনি কারণগুলো উল্লেখ করেন—

  • তোমরা আল্লাহকে চিনেছ, কিন্তু তাঁর হক আদায় করোনি।

  • তোমরা কোরআন পড়েছ, কিন্তু তার ওপর আমল করোনি।

  • তোমরা নবীজির প্রতি ভালোবাসার দাবি করেছ, কিন্তু তাঁর সুন্নাহ পরিত্যাগ করেছ।

  • তোমরা বলেছ, শয়তান তোমাদের শত্রু; অথচ তারই অনুসরণ করেছ।

  • তোমরা বলেছ, জান্নাত সত্য, কিন্তু তার জন্য কোনো আমল করোনি।

  • তোমরা বলেছ, জাহান্নাম সত্য, কিন্তু তা থেকে বাঁচার জন্য কোনো চেষ্টা করোনি।

  • তোমরা বলেছ, মৃত্যু সত্য, কিন্তু তার জন্য কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করোনি।

  • তোমরা মানুষের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত থেকেছ, অথচ নিজেদের দোষ-ত্রুটি ভুলে গেছ।

  • তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নেয়ামত ভোগ করেছ, কিন্তু তার শোকর আদায় করোনি।

  • তোমরা তোমাদের মৃতদের দাফন করেছ, কিন্তু তাদের থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করোনি। (আবু নুআইম আসফাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৮/১৫-১৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৬)

তাঁর এই ১০ উপদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. আল্লাহর হক

আল্লাহর হক হলো একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করা, আদেশ মানা, নিষেধ থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত না করা। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক হলো, তারা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোনোকিছুকে শরিক করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৫৬)

২. কোরআনের ওপর আমল না করা

কোরআন পাঠ করা একটি মহান ইবাদত। কিন্তু কোরআনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তেলাওয়াত নয়, বরং তার আলোকে জীবন গঠন করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোরআন হয় তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে, নয়তো তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)

যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করবে, তার শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে, কেয়ামতের দিন কোরআন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আর যে ব্যক্তি কোরআনকে অবহেলা করে তেলাওয়াত ও আমল থেকে দূরে থাকবে, কোরআনই কেয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ও অভিযোগ হিসেবে উপস্থিত হবে। (ইমাম নববি, আল-মিনহাজ, ৩/৯৭, দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত, ২০১২)

৩. সুন্নাহ পরিত্যাগ করা

রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসা ইমানের অপরিহার্য অংশ। তবে প্রকৃত ভালোবাসা সুন্নাহ অনুসরণের নাম। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)

নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমার সুন্নাহের প্রতি ভালোবাসাই আমার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন। আর যে আমাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসবে, সে জান্নাতে আমার সান্নিধ্য লাভ করবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৮)

যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে, কিন্তু নিজের কথা, কাজ ও জীবনাচরণে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ ও সুন্নাহের অনুসরণ করে না, তার ভালোবাসার দাবি প্রকৃত নয়। আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে নববি শরিয়ত ও মুহাম্মদি আদর্শকে আন্তরিকভাবে অনুসরণ করা। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ২/২৬, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)

৪. শত্রু জেনেও শয়তানের অনুসরণ

শয়তানের চিরন্তন লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করা, পাপকে আকর্ষণীয় করে তোলা এবং ধীরে ধীরে তাকে অবাধ্যতার অতলে ঠেলে দেওয়া। মানুষ জানে, শয়তান তার প্রকাশ্য শত্রু, তবুও প্রবৃত্তির মোহে পড়ে সে বারবার তার কুমন্ত্রণার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

ফলে গিবত, মিথ্যা, হিংসা, অহংকার, হারাম, অন্যায্য ভোগবিলাসসহ নানা পাপে জড়িয়ে পড়ে। এই আত্মবিরোধী আচরণ ক্রমেই অন্তরকে কলুষিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে, এমনকি একসময় সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতাও ক্ষীণ হয়ে যায়।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। তাই তাকে তোমরা শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করো। সে তার অনুসারীদের কেবল এ উদ্দেশ্যেই ডেকে বেড়ায়, যাতে তারা শেষ পর্যন্ত জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হয়ে যায়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৬)

৫. জান্নাত চেয়েও আমলে গাফলতি

প্রত্যেক মুসলমান জান্নাত কামনা করে। কিন্তু জান্নাত কেবল আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়, এটি নেক আমলের প্রতিফল। জান্নাত লাভের জন্য ইমান, ইবাদত, তাকওয়া ও সৎকর্ম অপরিহার্য।

আল্লাহ বলেন, ‘আর পুরুষ বা নারী যে-ই ইমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুর দানার আবরণ পরিমাণও অবিচার করা হবে না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৪)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার সমস্ত উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে সে ব্যক্তি ছাড়া যে অস্বীকার করে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কে অস্বীকার করবে?’ তিনি বললেন, ‘যে আমার আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্যতা করবে, সেই প্রকৃতপক্ষে অস্বীকার করল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৮০)

৬. জাহান্নাম ভয় করেও পাপ করা

জাহান্নামের শাস্তির কথা শুনলে স্বভাবতই মানুষের হৃদয় কেঁপে ওঠে। কিন্তু প্রকৃত ভয় সেটিই, যা মানুষকে পাপ থেকে দূরে এবং আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় রাখে।

আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে সংযত রেখেছে, তার আবাস হবে জান্নাত।’ (সুরা নাজিয়াত, আয়াত: ৪০–৪১)

অনেকেই জাহান্নামের ভয় মুখে প্রকাশ করে, কিন্তু সুযোগ পেলেই প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করেছে এবং দুনিয়ার জীবনকে (আখেরাতের উপর) অগ্রাধিকার দিয়েছে, নিশ্চয়ই জাহান্নামই হবে তার আবাসস্থল।’ (সুরা নাজিয়াত, আয়াত: ৩৭–৩৯)

৭. মৃত্যুর প্রস্তুতি না নেওয়া

ধর্মবিশ্বাসী হোক বা অবিশ্বাসী, কেউই মৃত্যুকে অস্বীকার করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

মানুষ মৃত্যুকে নিশ্চিত জেনেও তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে উদাসীন থাকে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি সে, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম ও হতভাগা সে, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে এবং আল্লাহর নিকট অলীক আশা-আকাঙ্ক্ষা রাখে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)

মৃত্যুর বিস্মৃতি মানুষকে দুনিয়ার মোহে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে, সে পরকালের প্রস্তুতির কথা ভুলে নিশ্চিত এক যাত্রার জন্য প্রস্তুতিহীন অবস্থায় দিন কাটাতে থাকে।

৮. নিজের দোষ ভুলে থাকা:

মানুষ নিজের দোষের চেয়ে অন্যের দোষ দেখতে বেশি পছন্দ করে। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না, কে তাকওয়াবান, তিনি তা ভালো জানেন।’ (সুরা নাজম : ৩২)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার নিজের দোষ তাকে অন্যের দোষ নিয়ে ব্যস্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, বুলুগুল মারাম, হাদিস: ৪৪৫)

আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ। যে ব্যক্তি সবসময় অন্যের ত্রুটি অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকে, দিনশেষে সে নিজের সংশোধনের সুযোগটাই হারিয়ে ফেলে।

৯. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় না করা

মানুষের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, সুস্থতা, পরিবার, রিজিক ও জীবনের প্রতিটি অনুকূল মুহূর্ত মহান আল্লাহর অগণিত নেয়ামতেরই অংশ। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে কখনো তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৪)

নেয়ামতের যথার্থ দাবি হলো কৃতজ্ঞতা। চোখের কৃতজ্ঞতা হলো হারাম থেকে দৃষ্টি সংযত রাখা, জিহ্বার কৃতজ্ঞতা হলো সত্য কথা বলা, আর সম্পদের কৃতজ্ঞতা হলো তা কল্যাণের পথে ব্যয় করা।

জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন, ‘শোকর হলো, আল্লাহর কোনো নেয়ামতকে তাঁর অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার না করা।’ (ইবনুল কাইয়িম জাওজি, মাদারিজুস সালেকিন, ২/৫৯২, দারু আতাআতিল ইলম, রিয়াদ, ২০২৪)

অনেকে আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করেও তার যথার্থ কৃতজ্ঞতা আদায়ে উদাসীন থাকে। ফলে ধীরে ধীরে তার অন্তরে অকৃতজ্ঞতার মরিচা জমে যায়।

১০. মৃতদের থেকে শিক্ষা না নেওয়া

প্রতিদিন জানাজার মিছিল বের হচ্ছে, কবর খোঁড়া হচ্ছে, প্রিয়জনদের মাটির বুকে শায়িত করা হচ্ছে। মানুষ এসব দৃশ্য নিজের চোখে দেখছে, মৃতদের বিদায় জানিয়ে আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যাচ্ছে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৫৪)

প্রতিটি মৃতদেহ আমাদের বলে যায়, একদিন তোমাদেরও এ পথেই যেতে হবে। তাই আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.)-এর এই দশ সতর্কবার্তা মূলত হৃদয়ের রোগ নির্ণয়ের দশটি আয়না। এগুলো আমাদের প্রত্যেকের জন্য আত্মসমালোচনার উপকরণ।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা