বাংলা চলচ্চিত্রে প্রেমের গল্প নতুন নয়। কিন্তু মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ প্রেমকে যে জায়গায় নিয়ে যায়, তা প্রচলিত প্রেমকাহিনির গণ্ডি অতিক্রম করে। সম্ভবত এ কারণেই অনেক দর্শক ছবিটিকে পরিচালকের ব্যক্তিগত ভাবনা বা ‘মনের খোরাক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ এখানে কোনো ভিলেন এসে নায়িকাকে তুলে নিয়ে যায় না, আর নায়কও মাখোমাখো প্রেম কিংবা অ্যাকশনের নায়ক নন। রইদ মূলত মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের গল্প। নিরেট বাস্তবতার গল্প। অথচ সেই বাস্তবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রেম, বিশ্বাস, অপরাধবোধ, মাতৃত্ব, পুরুষতান্ত্রিক অধিকারবোধ এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্ক।
প্রথম দেখায় সাদুকে গ্রামের আর দশজন খেটে খাওয়া মানুষের মতোই মনে হয়। যার নিজের বলতে আছে গ্রাম থেকে দূরে একটি ছোট্ট ঘর। ছোটবেলায় বাবার কাছে ‘কামলা’ বা ‘মুনি’দের গল্প শুনেছিলাম (যারা অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন)। সাদুও যেন সেই ধারারই একজন মানুষ। তার জীবন একাকী, নির্লিপ্ত এবং দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়া। বিয়ের মাধ্যমে সেই জীবনের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু কিছুদিন পর সে বুঝতে পারে, যে নারীকে সে বিয়ে করেছে তাকে সমাজ ‘পাগলি’ বলে চেনে এবং তার আগে একটি বিয়েও হয়েছিল।
এই মুহূর্তে সাদুর জীবন থমকে যেতে পারত। কিন্তু সে হার মানে না। সে আনন্দ খুঁজতে চায়, সংসার খুঁজতে চায়, ভালোবাসা খুঁজতে চায়। অথচ পাগলির আচরণ তাকে বিভ্রান্ত করে। একসময় সে মেলায় যাওয়ার অজুহাতে পাগলিকে দূরে ফেলে আসে। পাগলির কাকুতি-মিনতি সত্ত্বেও সে ফিরে তাকায় না। এখানেই পরিচালক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি সাধারণ অথচ গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
সাদু খারাপ মানুষ বিষয়টা তা নয়, বরং তার সরলতাই চরিত্রটির শক্তি। কিন্তু সেই সরল মানুষের মধ্যেও সমাজের তৈরি অধিকারবোধ কাজ করে। নিঃসঙ্গ এক মানুষ, যার জীবন কেবল দায়িত্ব পালন আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে সীমাবদ্ধ, সেও যখন ভালোবাসার স্বাদ পায়, তখন সেই ভালোবাসার ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর সেখানেই শুরু হয় ট্র্যাজেডি।
অন্যদিকে পাগলি চরিত্রটি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নির্মাণ। পুরো ছবিতে তার কোনো নাম নেই এমনকি সংলাপও তেমন নেই। বিয়ের পর তার পরিচয় শুধু ‘সাদুর বউ’। বাবা-মা নেই, মামার বাড়িতে বড় হওয়া এই মেয়েটির পৃথিবী বলতে সাদু এবং তার পালিত ছাগল কুলসুম। পরিচালক যেন তাকে প্রকৃতিরই এক কন্যা হিসেবে নির্মাণ করেছেন। তার সরলতা, প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং প্রচলিত সামাজিক আচরণের বাইরে অবস্থান তাকে সমাজের চোখে ‘পাগলি’ করে তুলেছে।
কিন্তু সত্যিই কি সে পাগলি?
এই প্রশ্নটিই পরিচালক দর্শকের সামনে ছুড়ে দেন।
আমার কাছে পাগলি কেবল একজন নারী নয়; বরং নারীসত্তার এক প্রতীক। যে সমাজে নারীর নিজের কোনো ঘর থাকে না, তার অস্তিত্ব প্রায়ই অন্য কারও পরিচয়ের সঙ্গে বাঁধা থাকে। ‘রইদ ’সেই বাস্তবতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে।
প্রথমে এটি একটি সাধারণ প্রেমের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যায়, এখানে প্রেম কোনো প্রাপ্তির বিষয় নয়; বরং হারিয়ে ফেলেও বহন করে নিয়ে চলার এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। এই চলচ্চিত্রের প্রেম শরীরের নয়, আত্মার। শারীরিক প্রেমের চাহিদা একসময় পূর্ণতা পেতে পারে, কিন্তু আত্মিক প্রেমের কোনো সমাপ্তি নেই। সে প্রেম অপেক্ষায় থাকে, স্মৃতিতে থাকে, অনুপস্থিতির মধ্যেও থেকে যায়।
তাই চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে বারবার মনে পড়ে যায় দেবদাস কিংবা ইউসুফ-জুলেখার প্রেমকাহিনির কথা। কারণ এখানেও মানুষ ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে— কখনও নিজের সীমাবদ্ধতায়, কখনও ভুল বোঝাবুঝিতে, কখনও সমাজের নির্মম বাস্তবতায়।
চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন একটি পাকা তালকে ঘিরে সাদুর জীবনে আবার ফিরে আসে তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী। পাগলি ঘরে ফিরে তালের পিঠা বানায়। সাদু সেই পিঠার স্বাদে যেন জীবনের আনন্দ ফিরে পায়। এরপর তাদের জীবনে আসে স্বল্পস্থায়ী সুখের সময়। কিন্তু সেই সুখও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
প্রতিবেশীর বাছুর চুরির অপবাদে পাগলিকে বেঁধে রাখা হয়। অথচ সেই অবস্থাতেও সে স্বামীর জন্য তালের পিঠা বানিয়ে রাখে। এখানে পরিচালক একটু দর্শকের সাথে মিথলজিক্যাল গেইম খেলার চেষ্টা করেছেন। এরপর আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরকে কেন্দ্র করে সাদু আবারও স্ত্রীর ওপর সন্দেহ করে। যে নারী তাকে ভালোবাসে, তার কথার চেয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে বেশি বিশ্বাস করে সে। এখানেই চলচ্চিত্রটি প্রেমের গল্প থেকে বিশ্বাসের গল্পে রূপ নেয়।
পাগলিকে মামার বাড়িতে রেখে আসার দৃশ্যটি ছবির অন্যতম হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। পাগলির অপলক চাহনি, বিদায়ের সময় তার বলা—“এইবার কিন্তু আমি আর ফিরমু না” এবং কুলসুমকে সাদুর কাছে রেখে দেয়ার অনুরোধ, সবকিছুই যেন নারী ও প্রকৃতির সম্পর্কের গভীর ইঙ্গিত বহন করে।
প্রকৃতি যেমন মানুষকে আশ্রয় দেয়, বিশ্বাস করে, নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়, নারীও তেমনি ভালোবাসতে জানে, অপেক্ষা করতে জানে। কিন্তু মানুষ যেমন প্রকৃতির সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করে, তেমনি পুরুষও অনেক সময় নারীর আস্থার মর্যাদা রাখতে ব্যর্থ হয়। ছবিটি সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু এই প্রশ্নগুলো দর্শকের মনে রেখে যায়।
পরবর্তীতে সাদু জানতে পারে, তার স্ত্রীই সত্য বলেছিল। তখন শুরু হয় তার অপরাধবোধের যাত্রা। কিন্তু নাম না জানার কারণে পাগলির বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হলেও পাগলিকে আর পায় না। এই সময়ে কুলসুমের প্রতি তার মায়া বেড়ে যায়। যেন কুলসুমই পাগলির স্মৃতির একমাত্র বাহক।
কিন্তু হঠাৎ এক বৃষ্টিভেজা রাতে পাগলি ফিরে আসে গর্ভবতী অবস্থায়। প্রথমে সাদু নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, গ্রামের মানুষের কথায় তার পুরুষতান্ত্রিক অধিকারবোধ আবারো জেগে ওঠে। সে অনাগত শিশুটিকে মেনে নিতে পারে না। সে সিদ্ধান্ত নিতে চায় কোন জীবন গ্রহণযোগ্য, কোন জীবন নয়। তাই সে তার স্ত্রীর গর্ভে থাকা সন্তানকে মেরে ফেলতে চায় ,কিন্তু যখন পাগলি দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “এই বাচ্চা আল্লাহর দান”, তখন প্রথমবারের মতো সাদুর কর্তৃত্ব ভেঙে পড়তে শুরু করে। অহমিকা বাদ দিয়ে সাদু নিজের ভেতরের মানুষটাকে সে দেখতে শুরু করে।
এই ভাঙনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটে এক নিঃশব্দ দৃশ্যে। সাদু শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে স্ত্রীর কাছে আশ্রয় নেয়। চারপাশে দেখা যায় বিভিন্ন প্রাণীর বাচ্চাদের। দৃশ্যটিকে কেবল দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে এক পুরুষের আত্মসমর্পণের মুহূর্ত। যে এতদিন বিচার করেছে, সে ক্ষমা চাইছে। যে আশ্রয় দিতে চেয়েছিল, সে-ই আশ্রয় খুঁজছে। বাংলা চলচ্চিত্রে পুরুষের ভঙ্গুরতা এত সংবেদনশীলভাবে খুব কমই দেখানো হয়েছে।
কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে সাদু তালের পিঠা পায়, কিন্তু তার স্ত্রীকে আর খুঁজে পায় না। ঋতু বদলায়, সময় পেরিয়ে যায়, পাগলি আর ফিরে আসে না। অপেক্ষাই হয়ে ওঠে সাদুর নিয়তি।
তারপর হঠাৎ পালিত ছাগল কুলসুম বাচ্চা প্রসব করে।এখানেই চলচ্চিত্রটির প্রতীক ব্যবহারে নির্মাতার মুন্সিয়ানা স্পষ্ট। মা ছাগলের মৃত্যু এবং পরবর্তীতে সেই ছাগলের মাংস খাওয়ার দৃশ্যকে নিছক ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে হারিয়ে যাওয়া আশ্রয়, শোক, অধিকারবোধ এবং আত্মদহনের ইঙ্গিত রয়েছে। একইভাবে তালকে গন্দমের সঙ্গে তুলনা করাও মানবজাতির আদি স্মৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। আদম ও হাওয়ার পৃথিবীতে অবতরণের সেই পুরাণ, যেখানে প্রেমের সঙ্গে জন্ম নেয় দায়িত্ব, কষ্ট, বিচ্ছেদ এবং মানবজীবনের অনিবার্য ট্র্যাজেডি।
মেজবাউর রহমান সুমনের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই যে তিনি দর্শকের জন্য কোনো একক ব্যাখ্যা নির্ধারণ করে দেন না। বরং প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি প্রতীক এবং প্রতিটি নীরবতার ভেতর একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রেখে দেন। ফলে রইদ দেখা শেষ হলেও শেষ হয় না। এটি দর্শকের ভেতরে থেকে যায়, নতুন প্রশ্ন তোলে, নতুন ব্যাখ্যার দিকে আহ্বান জানায়।
সবশেষের দৃশ্যে মাইকেল এঞ্জেলোর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘The Creation of Adam’ এর প্রতিবিম্ব লক্ষ করা যায়। পেইন্টিংয়ে আদম ও ঈশ্বরের আঙুল স্পর্শহীন থেকে যায়, সিনেমাতেও কি তাই? পরিচালক কি সাদু ও পাগলীর সেই ভালোবাসাকে পূর্ণতা দেন?
অভিনয়ের কথা আলাদা করে বলতে হয়। মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে সত্যিই গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ বলেই মনে হয়েছে। তার হাঁটা, চলা, সরল হাসি—সবকিছুই স্বাভাবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য। নাজিফা তুষিও অসাধারণ। বিশেষ করে তার নাচের দৃশ্য এবং থুথু ফেলার দৃশ্যটি দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
দু-একটি জায়গায় কণ্ঠ অভিনয় খানিকটা কানে লেগেছে। তবে সাউন্ড ডিজাইন, পোশাক পরিকল্পনা, শিল্প নির্দেশনা এবং চিত্রগ্রহণের সৌন্দর্য সেই সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে যায়। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে কোথাও মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই।
অনেক দিন পর এমন একটি বাংলা চলচ্চিত্র দেখলাম, যা শেষ হওয়ার পরও মাথার ভেতর চলতে থাকে।
সবশেষে বলা যায়, ‘রইদ’ কেবল প্রেমের চলচ্চিত্র নয়। এটি হারিয়ে ফেলা মানুষের গল্প, বিশ্বাসভঙ্গের গল্প, অপরাধবোধের গল্প এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমা ও গ্রহণযোগ্যতার গল্প। যখন প্রেমকে প্রায়ই ভোগ ও প্রাপ্তির ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, ‘রইদ ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্যিকারের প্রেম কখনও কখনও পাওয়াতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ধারণ করার নাম।






