রমজানে প্রতিবেশীর হক | ধর্ম

রমজানে প্রতিবেশীর হক | ধর্ম

<![CDATA[

প্রতিবেশী মানবসমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইসলামে প্রতিবেশীর হককে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি তাগিদ করেছেন যে, আমার কাছে মনে হয়েছে প্রতিবেশীকে মিরাসের অংশীদার বানিয়ে দেয়া হবে।’ (মুসলিম: ২৫২৪)।

ইসলামে প্রতিবেশীর হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রথমেই জানা দরকার প্রতিবেশীর সংজ্ঞা। প্রতিবেশী শুধু ঘরের পাশে থাকা লোকজনকে বোঝায় না। ইসলামে প্রতিবেশীর সংজ্ঞা বিস্তৃত। প্রতিবেশী হচ্ছে আশপাশে বসবাসকারী মুসলিম-অমুসলিম; আত্মীয়-অনাত্মীয়; নিকটতম-দূরতম সবই অন্তর্ভুক্ত। বাড়ি বা ঘরের প্রতিবেশী, হোস্টেলের প্রতিবেশী, ব্যবসায়ীদের দোকানের প্রতিবেশী, প্রফেশনালদের কর্মজীবনের প্রতিবেশী; যানবাহনে সিটের প্রতিবেশী সবাই।

কিন্তু আজকাল এ বিষয়ে আমাদের মাঝে চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে শহরের মানুষের মাঝে। বছরের পর বছর পার হয় পাশের বাড়ির মানুষের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয় না, খোঁজখবর নেয়া হয় না। অথচ প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ ও তাকে কষ্ট না দেয়াকে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কোরআনে প্রতিবেশীর হক 

পবিত্র কোরআনে সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহর ইবাদত ও তার সঙ্গে কাউকে শরিক না করা- এই বিধানের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের হক। তার মধ্যে রয়েছে মা-বাবার হক, আত্মীয়স্বজনের হক, এতিমের হক ইত্যাদি। এসব গুরুত্বপূর্ণ হকের সঙ্গেই আল্লাহ প্রতিবেশীর হককে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় প্রতিবেশীর হককে আল্লাহ কত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তা রক্ষা করা আমাদের জন্য কতটা জরুরি।

আরও পড়ুন: রোজা প্রথম কে রেখেছিলেন?

প্রতিবেশীর খোঁজ রাখা 

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি মুমিন নয় যে পেটপুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা: ২৬৯৯)।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেক প্রতিবেশীই এমন আছে, যাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে তারা অভাবে দিন কাটাচ্ছে। আবার কারো কাছে কখনো চাইবেও না। কোরআন মজিদে এদের ‘মাহরুম’ বলা হয়েছে। সুরা যারিয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও মাহরুমের (বঞ্চিতের) হক।’ (আয়াত: ১৯)।

এ ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য নিজ থেকে তাদের খোঁজখবর রাখা এবং দেয়ার ক্ষেত্রে এমন পন্থা অবলম্বন করা, যাতে সে লজ্জা না পায়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন।’ (বুখারি: ২৪৪২)

প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ

প্রতিবেশী একটি আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। তার সঙ্গে আচরণ কতটা সুন্দর রাখতে হবে তা বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই।

আবু শুরাইহ (রা.) বলেন, আমার কান শ্রবণ করেছে এবং আমার দুই চক্ষু প্রত্যক্ষ করেছে, যখন রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে সম্মান করে।’ (বুখারি: ৬০১৮)

প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়ার বিষয়টিকে নবী (সা.) ঈমানের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করেছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়! আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়! আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়! সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, কে সে হে আল্লাহর রাসুল? রাসুল (সা.) বললেন, যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (বুখারি: ৬০১৬)

প্রতিবেশীর দোষ ঢেকে রাখা

পাশাপাশি থাকার কারণে একে অপরের ভালোমন্দ কিছু জানাজানি হয়েই থাকে। গোপন করতে চাইলেও অনেক কিছু গোপন করা যায় না। প্রতিবেশীর এসব বিষয় পরস্পরের জন্য আমানত। নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণেই একে অপরের দোষ ঢেকে রাখা জরুরি।

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহও কেয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।’ (মুসলিম: ২৫৮০)

আরও পড়ুন: যে কারণে রোজার মহিমা ক্ষুণ্ন হয়

দশ গুণ বেশি গুনাহ

প্রতিবেশীর হক আদায় করা যেমন জরুরি, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া বা তার হক নষ্ট করা তেমনি বড় গুনাহ। একই অন্যায় প্রতিবেশীর সঙ্গে করলে অন্যের তুলনায় দশ গুণ বেশি বড় বলে গণ্য হয়। হজরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রা. বলেন, রাসুল (সা.) তার সাহাবিগণকে জেনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তারা বলল, তা তো হারাম। আল্লাহ ও তার রাসুল তা হারাম ঘোষণা করেছেন, তখন রাসুল (সা.) বললেন, কোনো ব্যক্তি দশজন নারীর সঙ্গে জেনা করলে যে গুনাহ, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে জেনা করা তার চেয়েও বেশি ও মারাত্মক গুনাহ। তারপর রাসুল (সা.) তাদের চুরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তারা বলল, তা তো হারাম। আল্লাহ ও তার রাসুল তা হারাম বলে ঘোষণা করেছেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, দশ বাড়িতে চুরি করা যত বড় অন্যায়, প্রতিবেশীর বাড়িতে চুরি করা এর চেয়েও বড় অন্যায়। (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৮৫৪)

প্রতিবেশী দরিদ্র হলে করণীয়

আর যদি প্রতিবেশী দরিদ্র হয় তাহলে এ বিষয়ে তার হক আরও বেশি। কারণ, দরিদ্রকে খাবার খাওয়ানো যেমন অনেক সওয়াবের কাজ, তেমনি দরিদ্রকে খাবার না খাওয়ানো জাহান্নামে যাওয়ার একটি বড় কারণ। কোরআন মজিদে ‘সাকার’ নামক জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে নামাজ না পড়ার বিষয়টির সঙ্গে দরিদ্রকে খাবার না খাওয়ানোও গুরুত্ব সহকারে উল্লিখিত হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘(জাহান্নামিকে জিজ্ঞেস করা হবে) অর্থাৎ কোন বিষয়টি তোমাদের ‘সাকার’ নামক জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছে? (তারা উত্তরে বলবে) আমরা নামাজ পড়তাম না এবং দরিদ্রকে খাবার খাওয়াতাম না।’ (সুরা মুদ্দাসসির: ৪২-৪৪)।

]]>