সম্পর্ক না থাকলেও কেন বার বার প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখছেন?

সম্পর্ক না থাকলেও কেন বার বার প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখছেন?

ব্রেকআপ হয়ে গেছে। সম্পর্ক শেষ, যোগাযোগও নেই। তবু হঠাৎ মনে হলো ‘দেখি তো, ও এখন কী করছে!’ কখনো মিউচুয়াল বন্ধুর স্টোরি দেখে, কখনো নিছক কৌতূহলে, আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই খুলে ফেলছেন সাবেকের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল। নিজেকেই হয়তো প্রশ্ন করছেন, ‘আমি তো আর ফিরে যেতে চাই না, তাহলে বারবার ওর প্রোফাইল দেখি কেন?’ মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অভ্যাসের পেছনে কাজ করতে পারে বেশ কিছু মানসিক কারণ।

ব্রেকআপের পর সাবেকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঁকি দেয়াকে অনেকেই নিজের দুর্বলতা বা নিয়ন্ত্রণের অভাব মনে করেন। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়। এর পেছনে থাকতে পারে কৌতূহল, পুরোনো স্মৃতি, তুলনা করার প্রবণতা, অসমাপ্ত আবেগ কিংবা সম্পর্কের কোনো ‘ক্লোজার’ খোঁজার চেষ্টা। ভারতের বেঙ্গালুরুর মার্গা মাইন্ড কেয়ারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে. এ ধরনের আচরণের কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এবং কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা যায়, সে বিষয়ে দিয়েছেন পাঁচটি পরামর্শ।

সাবেকের প্রোফাইল দেখা আগ্রহ কেন তৈরি হয়

সাবেকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার অর্থ এই নয় যে আপনি আবার তার কাছে ফিরতে চান। অনেক ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। আগে সম্পর্ক শেষ হলে সাবেকের খবর জানতে সরাসরি যোগাযোগ করতে হতো কিংবা পরিচিত কারও কাছ থেকে শুনতে হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব অনেকটাই মুছে দিয়েছে।

মিউচুয়াল বন্ধুর স্টোরিতে সাবেককে দেখা গেল, ‘সাজেস্টেড অ্যাকাউন্টে’ তার প্রোফাইল চলে এল, কেউ তার কোনো পোস্ট শেয়ার করল ব্যস, পুরোনো কৌতূহল আবার জেগে উঠতে পারে। সাবেককে সুখী, সফল কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে দেখেও অনেকের মনে তুলনার প্রবণতা তৈরি হয়। মনে হতে পারে, ‘ও এত দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গেল কীভাবে?’ কিংবা ‘ব্রেকআপের পর ওর জীবন এত ভালো চলছে কেন?’ সাবেক কীভাবে সম্পর্ক বা বিচ্ছেদকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছেন, সেটিও অনেকে খেয়াল করতে থাকেন।

সম্পর্ক শেষ হলেও আবেগ সব সময় একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। পুরোনো স্মৃতি, মানসিক টান কিংবা কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার অনুভূতি মানুষকে সাবেকের প্রোফাইলে ফিরিয়ে নিতে পারে। কেউ হয়তো জানতে চান, সাবেক নতুন সম্পর্কে গেছেন কি না। কেউ খুঁজতে থাকেন এমন কোনো ইঙ্গিত, যা থেকে বোঝা যাবে ‘সেও কি আমাকে মিস করে?’

মনোবিজ্ঞানী সুহাসের মতে, ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। মনে হতে পারে, সাবেকের জীবনে এমন কিছু ঘটছে যা আপনি জানছেন না। একসময় এই কৌতূহল অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। এমনকি একাকিত্ব, একঘেয়েমি, কোনো পুরোনো স্মৃতি কিংবা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ খুলে ফেলাও আপনাকে সেই পরিচিত প্রোফাইলে নিয়ে যেতে পারে।

যেভাবে সাবেকের প্রোফাইল দেখা বন্ধ করবেন

অভ্যাসটি এক দিনে বন্ধ করা কঠিন হতে পারে। তবে কয়েকটি বিষয় মেনে চললে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

১. আগে বুঝুন, কখন ইচ্ছাটা বেশি হয়

প্রথমেই খেয়াল করুন কখন আপনি সাবেকের প্রোফাইল দেখতে চান। একাকী লাগছে? মন খারাপ? বিরক্ত লাগছে? কোনো মিউচুয়াল বন্ধুর পোস্ট দেখেছেন? নাকি পুরোনো কোনো স্মৃতি মনে পড়েছে? ট্রিগারটি চিহ্নিত করতে পারলে তার বদলে অন্য কোনো কাজ বেছে নেওয়া সহজ হবে।

২. সাবেকের প্রোফাইলটি সহজে যেন চোখে না পড়ে

মিউট বা আনফলো করতে পারেন। প্রয়োজন হলে কথোপকথন আর্কাইভ করে রাখুন এবং প্রোফাইলে যাওয়ার সহজ পথগুলো সরিয়ে দিন। লক্ষ্য হলো সাবেকের উপস্থিতি যেন সারাক্ষণ আপনার চোখের সামনে না থাকে।

৩. ইচ্ছা থাকলেই নিয়ন্ত্রণ

প্রোফাইল দেখার তীব্র ইচ্ছা হলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপ খুলবেন না। নিজেকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় দিন। এই সময়টায় হাঁটতে পারেন, কোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে পারেন, গান শুনতে পারেন কিংবা অন্য কোনো কাজে মন দিতে পারেন। অনেক সময় তীব্র ইচ্ছাটা কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই কমে যায়।

৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিকে পুরো বাস্তবতা ভাববেন না

সাবেকের প্রোফাইলে তাকে খুব সুখী, সফল কিংবা নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে তাই তার জীবন সত্যিই এমন চলছে, এমনটা ধরে নেয়া ঠিক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের বাছাই করা অংশই তুলে ধরে। তাই আপনার ‘সেরে ওঠার’ সময়কে সাবেকের অনলাইন উপস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে নিজের ওপরই অযথা চাপ তৈরি হতে পারে।

৫. প্রোফাইল দেখার পর আপনার কেমন লাগে, খেয়াল করুন

একবার প্রোফাইল দেখার পর নিজেকে প্রশ্ন করুন ভালো লাগছে, নাকি আরও খারাপ লাগছে? যদি বারবার দেখার পর উদ্বেগ, মন খারাপ, ঈর্ষা, ঘুমের সমস্যা কিংবা সাবেকের সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বাড়তে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এই অভ্যাসটি আপনাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে না; বরং মানসিক অস্থিরতা আরও বাড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন

সাবেকের প্রোফাইল এক-দুবার দেখলেই তা মানসিক সমস্যার লক্ষণ নয়। তবে যদি এ নিয়ে নিয়মিত উদ্বেগ তৈরি হয়, আশাহীন লাগে, ঘুমের সমস্যা হয় কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে মনোযোগ দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তখন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মানসিক সমস্যাগুলো মূল্যায়ন করতে পারেন। পাশাপাশি কাউন্সেলর বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ এবং বিচ্ছেদের পর নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করতে পারেন। কারণ সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেই মনের অভ্যাসটা সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় না। কখনো কখনো সাবেকের প্রোফাইল থেকে বেরিয়ে আসার আগে নিজের মনটাকেই সেই পুরোনো সম্পর্ক থেকে বের করে আনতে হয়।