সৌন্দর্যের অপরূপ চৈতন্যে

ছয় ঋতুর এই দেশে আমাদের শিল্পীরা প্রতিটি ঋতু নিয়েই ছবি আঁকেন। আমাদের কবিরা লেখেন কবিতা। শিল্পীর তুলিতে ফুটে ওঠে বৃষ্টিমুখর বর্ষা, কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল, নীলাভ আকাশজুড়ে সাদা মেঘের শোভা কিংবা দিগন্তজুড়ে কাশফুলের মেলা। কবির কবিতায় ঋতুবন্দনা ঘুরেফিরে চলে আসে বারবার। শাম্মী ইয়াসমিন এ ঋতুবৈচিত্র্যের দেশেই বেড়ে ওঠা এক চিত্রশিল্পী। এ দেশের ঋতুবৈচিত্র্য তাকেও প্রভাবিত করে আর সব শিল্পী–কবির মতো। তিনি গত শতকের শিল্পী, অথচ তাঁর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী করছেন একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে। ঢাকার ধানমন্ডিতে শিল্পী সফিউদ্দীন শিল্পালয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলছে এ প্রদর্শনী। শিল্পী তাঁর প্রদর্শনীর নাম রেখেছেন ‘ঋতু রঙে আঁকা’। আমাদের ষড়ঋতুর নানা বিষয় ও বৈশিষ্ট্য তাঁর আঁকায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর আঁকার মাধ্যম জলরং, জলরঙে ধৌত পদ্ধতি ও ওয়াশ এবং অ্যাক্রেলিক রং।

ঢাকার আগা মসিহ লেনের বাড়িতে সংস্কৃতিবান্ধব পরিবেশে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা থেকে নৃত্যচর্চা করে তিনি নৃত্যশিল্পী হয়েছেন, একজন কোরিওগ্রাফার হিসেবে চারুকলার অনুষ্ঠানগুলোয় নির্দেশনাও দিতেন।

তাঁর শিক্ষক বরেণ্য চিত্রশিল্পী চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক হাশেম খান শাম্মী ইয়াসমিনের অধ্যয়ন ও তাঁর কাজ সম্পর্কে প্রদর্শনীর ব্রোশিওরে লিখেছেন, ‘তিনি নান্দনিক সুষমায় নিজের অন্বেষাকে মূর্ত করে তুলতে পেরেছেন। বাংলার রমণীকুলের মাধুর্য ও সৌন্দর্যমণ্ডিত অবয়বের ছন্দময় দেহসৌষ্ঠব, অভিব্যক্তিকে নিজের শিল্পবোধের ক্যারিশমায় বাঙ্‌ময় করে তুলতে পেরেছেন। নিসর্গের রূপকে চিত্রে বিবৃত করেছেন সৌন্দর্যের অপরূপ চৈতন্যে।’

প্রসাধন

শিল্পী শাম্মী ইয়াসমিনকে আমি জানি গত শতকের আশির দশকের শুরু থেকে। চারুকলা থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি তখন কর্মজীবনে বিসিক নকশাকেন্দ্রে নকশাবিদ। সহকারী প্রধান নকশাবিদ হিসেবে তিনি অবসর নিয়েও ছবি আঁকায় সক্রিয় আছেন। পুরান ঢাকার আগা মসিহ লেনের বাড়িতে সংস্কৃতিবান্ধব পরিবেশে বড় হয়েছেন। ছোটবেলা থেকে নৃত্যচর্চা করে তিনি নৃত্যশিল্পী হয়েছেন, একজন কোরিওগ্রাফার হিসেবে চারুকলার অনুষ্ঠানগুলোয় নির্দেশনাও দিতেন।

৬৮ বছর বয়সে শিল্পী শাম্মি ইয়াসমিনের প্রথম একক প্রদর্শনী হলেও গত অর্ধশতাধিক বছরে তিনি এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী ও জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীসহ অসংখ্য চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।

শাম্মীর আঁকা ছবিতে মেয়েদের সৌন্দর্য, ফুল, প্রজাপতি, খোলা আকাশে নানা রঙের বারতা নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, যা তাঁর ছবির দর্শককে বাইরের অশান্ত, অসুন্দর বাস্তবতা থেকে কল্পনার মনোমুগ্ধকর ও সুন্দর পরিবেশে নিয়ে যায়!

শাহজাদী, উডকাট প্রিন্ট

প্রদর্শনী দেখতে যেয়ে ‘অপ্সরী’ নামে একটি ছবি দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। ছবিতে এক গল্পের দেখা পেলাম—জল আনতে গিয়ে কোন এক গাছের গোড়ায় বসে সামনের কলসে ক্লান্ত এক সুশ্রী নারী মাথা এলিয়ে অধোবদনে বসে আছে! ‘অপ্সরী’ ২০২৪ সালে আঁকা জলরঙের ধৌত পদ্ধতির কাজ।

একই পদ্ধতিতে আঁকা ‘সখী’ শীর্ষক আরেকটি কাজে দুই সখীর অবয়ব ২০০১ সালের কাজ। স্বল্প রঙের ওয়াশে এক রঙের মধ্যে আরেক রঙের স্বচ্ছন্দে মিশে যাওয়ায় মায়াবী একটি ভাব তৈরি হয়েছে।

জলরঙের ওয়াশে আঁকা ‘প্রসাধন’ নামের আরেকটি নারী অবয়ব যেন আবয়বিক রহস্যময়তার সৌন্দর্যে প্রস্ফুটিত হয়েছে!

শাম্মীর আঁকা সাম্প্রতিক কাজগুলোয় মাধ্যমগত বদল লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৫ সাল থেকে কলাকেন্দ্রে তিনি কিছু উডকাট প্রিন্ট করতে শুরু করেন। এই মাধ্যমের কতক কাজ এই প্রদর্শনীর চিত্র সমাবেশে ব্যতিক্রম এনেছে। নৃত্যরত রমণী ও শাহজাদী উডকাট প্রিন্টের আবয়বিক চিত্র।

স্বপ্ন, ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক

সম্প্রতি ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে বেশ কিছু কাজ করেছেন শাম্মী ইয়াসমিন। এর মধ্যে আছে বাহারি ফুলশোভিত বাগান, নারীর ভাবুক অবয়ব, রমণীয় সৌন্দর্য। এই মাধ্যমে কিছু নিরীক্ষাও করেছেন শিল্পী। যেমন বড় ক্যানভাসে ‘স্বপ্ন’ শিরোনামে আঁকা এক সুশ্রী তরুণীর অবয়বের সঙ্গে শিল্পী নানা বস্তুকে নিয়ে গঠন তৈরি করে নিজের এত দিনকার চিত্ররীতি থেকে খানিকটা বেরিয়ে আসার সংকেত দিয়েছেন। তাঁর দর্শক ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে এটি শিল্পীর চিন্তনপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের অভিঘাতের পাশাপাশি তাঁর মননশীলতার ইতিবাচকতা তুলে ধরেছে।

অর্ধশতকের শিল্পীজীবনে তাঁর এই একক চিত্রপ্রদর্শনী শিল্পী শাম্মী ইয়াসমিনের জন্য সবচেয়ে বড় একটি মাইল ফলক। এই প্রণোদনা নিয়ে নিশ্চয়ই তিনি সৃজনে আরও এগিয়ে যাবেন।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার এ প্রদর্শনীর শেষ হবে।