
মহাবিশ্বে মানুষ কি একা? এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এক ঐতিহাসিক মাইলফলকের মুখোমুখি হলেন বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। প্রথমবারের মতো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত একটি সুদূর গ্রহ (এক্সোপ্ল্যানেট) থেকে সরাসরি আসা শক্তিশালী রেডিও সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তারা।
হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকস ও ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের একদল গবেষকের যৌথ অনুসন্ধানে এই যুগান্তকারী সাফল্য এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্ববিখ্যাত ‘মিরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ অ্যারে’ (MeerKAT) ব্যবহার করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে চার দফায় চালানো নিবিড় পর্যবেক্ষণে মেলে এই সংকেতের সন্ধান।
কীভাবে এলো এই সংকেত? এলিয়েনদের বার্তা নাকি প্রাকৃতিক ঘটনা?
পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩.৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ‘বেটা পিক্টোরিস’ নক্ষত্রমণ্ডলে নজর রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে থাকা ‘বেটা পিক্টোরিস বি’ নামের এক বিশালাকার গ্রহ থেকেই মূলত ভেসে এসেছে এই রেডিও তরঙ্গ।
এলিয়েনের বার্তা নয়: সাধারণ মানুষের মনে ভিনগ্রহীদের কথা উঠলেও বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন—এটি কোনো এলিয়েন বা অদেখা প্রাণীদের পাঠানো প্রযুক্তিগত বার্তা নয়।
বিশাল মেরুজ্যোতি (অরোরা): গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে মহাজাগতিক চার্জযুক্ত কণার সংঘর্ষের ফলে সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে এক অবিশ্বাস্য মেরুজ্যোতি বা অরোরা। সেই অরোরা থেকেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে এই রেডিও সিগন্যাল।
ইসিএমআই প্রক্রিয়া: বিজ্ঞানীদের মতে, ‘ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন ম্যাজার অস্থিতিশীলতা’ (ECMI) নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সিগন্যাল তৈরি হয়েছে, যা আমাদের পৃথিবী এবং বৃহস্পতি গ্রহের মেরুজ্যোতি তৈরির ক্ষেত্রেও কাজ করে।
“অত্যন্ত উজ্জ্বল কোয়াসারকে রেফারেন্স ধরে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই রেডিও বিস্ফোরণ নক্ষত্র থেকে নয়, সরাসরি গ্রহটি থেকেই আসছে। এটি সৌরজগতের বাইরে এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণায় একেবারেই এক নতুন অধ্যায়।”— গবেষক দল (হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সিএফএ)
কেমন এই বেটা পিক্টোরিস বি (Beta Pictoris b)?
২০০৮ সালে আবিষ্কৃত এই দৈত্যাকার গ্রহটি মহাজাগতিক পরিমণ্ডলে বেশ বৈচিত্র্যময়:
- দৈত্যাকার আকার: গ্রহটির ভর আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির চেয়েও প্রায় ১০ গুণ বেশি!
- পাগলাটে ঘূর্ণন গতি: নিজ অক্ষে একবার ঘুরতে গ্রহটি সময় নেয় মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা।
- ভয়াবহ চৌম্বকক্ষেত্র: রেডিও সংকেতের তীব্রতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেটা পিক্টোরিস বি-এর চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ শক্তিশালী!
ভবিষ্যতের নতুন দিগন্ত
এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের পর গবেষকরা এখন কাছের পাঁচটি নক্ষত্রমণ্ডলের আরও ৭টি বৃহৎ এক্সোপ্ল্যানেটে নজর রাখার পরিকল্পনা করছেন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, নতুন প্রজন্মের রেডিও টেলিস্কোপের সক্ষমতা ৫ থেকে ৭ গুণ বৃদ্ধি পেলে মহাবিশ্বের গভীর থেকে এমন আরও শত শত রেডিও বার্তা ও গ্রহের উপস্থিতি উন্মোচিত হবে।
এনএন/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬




