বাংলাদেশের কৃষি খাতের রূপান্তর এবং শিল্পায়নের ইতিহাসে ড. মো. আলী আফজাল এক অনন্য ও অপরিহার্য নাম। ১৯৬৭ সালের ২২ মার্চ মাগুরা জেলার এক নিভৃত জনপদে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজ কেবল একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী হিসেবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে পালন করছেন এক ঐতিহাসিক ভূমিকা।
শৈশব থেকেই মেধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই ব্যক্তিত্ব তার শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে—এসএসসি থেকে শুরু করে বিএসসি, এমএস এবং পিএইচডি পর্যন্ত সব জায়গায় প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন। তার এই প্রখর মেধার প্রতিফলন পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই তার দীর্ঘ দুই দশকের বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারী) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ২২টি উচ্চফলনশীল ডালজাতীয় শস্যের জাত উদ্ভাবন করেন, যা বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে এক অসামান্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে তার ৮০টিরও বেশি গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
ড. আফজালের জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল ল্যাবরেটরির চার দেয়ালে বন্দি কোনো গবেষক ছিলেন না; বরং গবেষণার নির্যাসকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি এক আধুনিক উদ্যোক্তার পরিচয় দিয়েছেন।
একজন বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটি হার মানায় যেকোনো চলচ্চিত্রকেও। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২০০১ সালে একটি ক্ষুদ্র পোল্ট্রি খামার দিয়ে শুরু করা তার সেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ আজ ‘কৃষিবিদ গ্রুপ’ নামক এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আবাসন, সিড, ফিড এবং আইটিসহ প্রায় ৪২টি কোম্পানি এই গ্রুপের অধীনে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। তবে ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির চেয়েও ড. আফজালের কাছে বড় প্রাপ্তি হলো তার প্রতিষ্ঠানের গবেষণা দলের মাধ্যমে ৬৬টি নতুন শস্যের জাত উদ্ভাবন করা।
বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণায় এমন বিপুল বিনিয়োগ ও ধারাবাহিক সাফল্য বাংলাদেশে বিরল। তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বেস্ট এগ্রি রিসার্চার ২০২৩’ সহ মাদার তেরেসা ও নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বৈশ্বিক মহৎ প্রাণ ব্যক্তিদের নামে প্রবর্তিত বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তবে ড. মো. আলী আফজাল কেবল অতীত অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার মানুষ নন; তিনি সর্বদা বাংলাদেশের আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সুপরিকল্পিত আবাসন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণাত্মক মতামত প্রদান করে আসছেন। বিশেষ করে বৈশ্বিক সংকটকালীন সময়ে কৃষি ও আবাসন খাতের সংকট উত্তরণে তার বক্তব্যগুলো এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ড. আফজালের গবেষণালব্ধ জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা মাঠপর্যায়ের কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তিনি যখন ‘বারী’তে কর্মরত ছিলেন, তখন ডালজাতীয় শস্যের ওপর তার নিবিড় গবেষণা দেশের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। তার উদ্ভাবিত জাতগুলো উচ্চফলনশীল হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও সক্ষম ছিল। বিজ্ঞানী হিসেবে তার এই সুখ্যাতি তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ অর্জনের গৌরব লাভ করেন। তবে তার জীবনের মোড় ঘোরে যখন তিনি অনুভব করেন যে, কেবল সরকারি গবেষণার মাধ্যমে দেশের বিশাল কৃষি চাহিদাকে পূর্ণাঙ্গভাবে মেটানো সম্ভব নয়। এই চিন্তা থেকেই তিনি বেসরকারি উদ্যোগে গবেষণা ও কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কৃষিবিদ গ্রুপের প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে রয়েছে তার সেই বিজ্ঞানী সত্তার ছাপ। বিশেষ করে মানসম্মত বীজ এবং আধুনিক পশুখাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা দল কেবল ফলন বাড়ানো নয়, বরং বীজের গুণগত মান রক্ষা এবং রোগবালাই প্রতিরোধী জাত তৈরির ওপর নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাই কৃষিবিদ গ্রুপকে অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে তুলেছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ড. আফজাল সবসময়ই কৃষকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কৃষি কার্ডের মতো ডিজিটাল উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় হলেও এর সুফল যেন প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের যে আধিপত্য, তা ভাঙতে হলে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো অপরিহার্য। তিনি তার বিভিন্ন বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, যদি কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য না পায় এবং ডিজেলের মতো মৌলিক উপকরণের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিড়ম্বনা সহ্য করে, তবে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমের সেচ কার্যক্রমে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর তিনি বারবার জোর দিয়েছেন। তার মতে, জ্বালানি সংকট কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়, এটি মূলত একটি খাদ্য নিরাপত্তার সংকট। যদি সেচ পাম্পগুলো সচল না থাকে, তবে আমাদের কোটি কোটি মানুষের ভাতের থালা শূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি লজিস্টিক সুবিধাগুলো সুচারুভাবে প্রদান করা তার অন্যতম প্রধান দাবি।
সাম্প্রতিক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা যখন বাংলাদেশের কৃষি ও আবাসন খাতকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, তখন ড. আফজালের বিশ্লেষণ অত্যন্ত সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে তিনি তার সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেছেন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায়। তার মতে, জ্বালানি তেলের সংকটের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে কৃষিতে। বর্তমানে বাংলাদেশের বোরো ধানের চাষাবাদ মূলত সেচনির্ভর এবং এই সেচ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ডিজেল চালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। যদি কৃষক সময়মতো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিজেল না পায়, তবে মাঠের ধান শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। কারণ আমাদের বার্ষিক চাহিদার একটি বিরাট অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার যে চেষ্টা করছে, তাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তবে তার মতে, এই প্রক্রিয়ায় যেন কৃষকরা সরাসরি এবং ভোগান্তিহীনভাবে জ্বালানি পায় সেটি নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। চাষীদের ডিজেল সংগ্রহে যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বা যে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে, তা উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন।
ড. আফজালের ভাবনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের আবাসন খাত ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভূমি ব্যবস্থাপনা। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন যে, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আমাদের চাষযোগ্য কৃষি জমি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটি এবং ২১০০ সাল নাগাদ ৩৫ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে হলে আমাদের এক ইঞ্চি কৃষি জমিও নষ্ট করার সুযোগ নেই। অথচ বর্তমানে গ্রামের পর গ্রাম অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি তৈরির ফলে কৃষি জমি বসতবাড়িতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
তার মতে, এই সমস্যার একমাত্র টেকসই সমাধান হলো ‘ভার্টিকাল এক্সপানশন’ বা উল্লম্ব সম্প্রসারণ। অর্থাৎ ভূমির ওপর চাপ কমাতে হলে আমাদের বহুতল ভবনের দিকে নজর দিতে হবে। ড. আফজাল মনে করেন, বিদ্যমান ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বা ভবনের উচ্চতা নিয়ে যে সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হয়েছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কারণ হতে পারে। তিনি মনে করেন, ঢাকার মতো মেগাসিটিতে নির্দিষ্ট এলাকায় উচ্চতা সীমাবদ্ধ না রেখে বরং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ৪০ থেকে ৫০ তলা ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে করে অল্প জায়গায় অনেক মানুষের আবাসন নিশ্চিত হবে এবং কৃষিজমি রক্ষা পাবে।
আবাসন খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং আধুনিকায়ন নিয়েও ড. আফজাল যথেষ্ট সোচ্চার। তিনি মনে করেন, একটি বহুতল ভবন কেবল ইট-পাথরের দেয়াল নয়, বরং এটি একটি আধুনিক জীবন ব্যবস্থার কেন্দ্র। ড্যাপের যে বর্তমান রূপরেখা, তাতে ছোট ছোট প্লটে ভবন নির্মাণের যে সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে, তা মূলত আবাসন সংকটে ইন্ধন দিচ্ছে। তিনি বৈশ্বিক মেগাসিটিগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, যেখানে আবাসন সংকট প্রকট সেখানে উল্লম্ব সম্প্রসারণই একমাত্র পথ। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে উচ্চতা সীমা আরোপ করায় শহরটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, যা ট্রাফিক জ্যাম ও লজিস্টিক খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ড. আফজালের প্রস্তাব হলো, সরকারের উচিত হবে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও উন্নত ড্রেনেজ সিস্টেম নিশ্চিত করে ডেভেলপারদের বহুতল ভবন নির্মাণে উৎসাহিত করা। এতে শহর যেমন দৃষ্টিনন্দন হবে, তেমনি মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন সহজলভ্য হবে। আবাসন খাতের স্থবিরতা কাটাতে তিনি একটি আধুনিক নীতিলক্ষ্য তৈরির ওপর জোর দেন, যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা উভয়ই গুরুত্ব পাবে।
তার মতে, আবাসন খাতের নেতৃত্ব বিকাশে এক ধরনের ঐতিহাসিক দুর্বলতা থাকায় ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে সমস্যার সঠিক ও যৌক্তিক চিত্র তুলে ধরতে পারছেন না, যা এই শিল্পের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। নেতৃত্বের এই অভাব কাটাতে তিনি দক্ষ ও গবেষকধর্মী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে রিহ্যাব-এর মতো সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন যে, কেবল নিজেদের মুনাফা চিন্তা না করে জাতীয় স্বার্থে কথা বলতে হবে। যুদ্ধের কারণে রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া জরুরি। অন্যথায় আবাসন খাতের এই ধস দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় বিপদে ফেলবে, কারণ এর সাথে রড, সিমেন্ট, ইলেকট্রিক ও টাইলস শিল্পসহ শত শত সহায়ক শিল্প জড়িত।
কৃষি ও আবাসন খাতের এই পরস্পরবিরোধী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ড. মো. আলী আফজাল একটি সুদূরপ্রসারী ও বিজ্ঞানভিত্তিক ‘জনিং’ ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন। তার মতে, সারা বাংলাদেশকে একটি সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় এনে চিহ্নিত করতে হবে কোন ভূমি কেবল কৃষির জন্য, কোনটি শিল্পের জন্য এবং কোনটি আবাসনের জন্য নির্ধারিত থাকবে। মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো যেভাবে ১০০ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে আগাচ্ছে, আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। বিশেষ করে গ্রামের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে যদি সরকারি উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায় এবং কিস্তিতে গ্রামের মানুষকে সেখানে থাকার সুযোগ করে দেওয়া যায়, তবেই কেবল কৃষি জমি রক্ষা করা সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন, আমাদের পরিকল্পনাগুলো স্বল্পমেয়াদী না হয়ে দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন। যেমন মেট্রোরেল বা যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমরা মাটির নিচের স্তরে বহুমুখী লাইনের কথা চিন্তা করতে পারতাম, যা ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলাতে সক্ষম হতো। ড. আফজালের এই ভাবনা কেবল একজন ব্যবসায়ী বা বিজ্ঞানীর নয়, বরং একজন দেশপ্রেমিক চিন্তকের আকুতি যা আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ নির্দেশ করে।
উদ্ভাবনই হলো উন্নয়নের চাবিকাঠি—এই মন্ত্রকেই ড. আফজাল তার জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। তিনি যেমন বিজ্ঞানাগারে নতুন নতুন শস্যের জাত উদ্ভাবন করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার স্বপ্ন দেখেন, তেমনি আধুনিক স্থাপত্য ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এক সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবনের স্বপ্নও বুনে চলেছেন। তার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন যে, একটি জাতির সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারের ওপর। কৃষি জমিকে রক্ষা করা এবং আবাসনকে আধুনিক করা—এই দুইয়ের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রয়োজন, ড. আফজাল সেই পথেরই পথিক। তার প্রতিষ্ঠিত কৃষিবিদ গ্রুপ এখন কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবেও নিজেদের ব্র্যান্ড পরিচিতি গড়ে তুলছে। তিনি সবসময় একটি বিষয় মনে করিয়ে দেন যে, আমরা যদি আমাদের মেধা ও সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে না লাগাই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
ড. আফজালের দর্শন হলো মাটির সাথে মানুষের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করা। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া কৃষি খাতকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। তাই তিনি তার প্রতিষ্ঠানে গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তার নেতৃত্বে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল বীজগুলো দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে। একইসাথে তিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নতুনত্ব এনেছেন এই চিন্তা থেকে যে, মানুষকে আবাসন দিতে গিয়ে আমরা যেন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না করি। তার প্রস্তাবিত উল্লম্ব আবাসন ব্যবস্থা কার্যকর হলে শহর ও গ্রাম—উভয় জায়গাতে মানুষের বসবাসের মান উন্নত হবে এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমবে। তিনি প্রায়ই উদাহরণ দেন যে, সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মতো দেশগুলো কীভাবে সীমিত জমিতে বিশাল জনসংখ্যাকে আবাসন দিচ্ছে। যদি তারা পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? এখানে মূলত সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ড. আফজাল বিশ্বাস করেন, আগামীর বাংলাদেশ হবে একটি মেধাভিত্তিক ও বিজ্ঞাননির্ভর রাষ্ট্র, যেখানে কৃষি ও শিল্প একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডে দেশপ্রেম ও সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কেবল একজন বৃহৎ উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য লড়াই করছেন না, বরং একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ার মিশনে কাজ করছেন। তার জীবনের এই কর্মময় পথচলা এবং সুদৃঢ় কর্মপরিকল্পনা আগামী দিনের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি আদর্শ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করবে। আধুনিক মনন, বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি এবং উদ্যোক্তার সাহসিকতা—এই তিনের সংমিশ্রণে ড. মো. আলী আফজাল বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত কৃষিবিদ গ্রুপ কেবল একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পায়নের মেলবন্ধনের এক সফল গবেষণাগার। তিনি বিশ্বাস করেন যে, তরুণ প্রজন্মকে যদি কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করা যায় এবং তাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা তুলে দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি।
পরিশেষে, ড. মো. আলী আফজালের জীবন ও কর্ম আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, মেধা আর পরিশ্রমের সাথে যদি স্বপ্ন ও দেশপ্রেম যুক্ত হয়, তবে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। মাগুরা থেকে শুরু হওয়া এক সাধারণ কিশোরের যাত্রা আজ তাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তার আসনে বসিয়েছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ল্যাবরেটরির গবেষণাকে মাঠে নিয়ে যেতে হয় এবং কীভাবে মাটির মায়াকে পুঁজি করে মহীরুহ গড়ে তুলতে হয়।
তার প্রস্তাবিত ‘ভার্টিকাল আবাসন’ এবং ‘নিবিড় কৃষি’ আজ সময়ের দাবি। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যদি তার এই বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক পরামর্শগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন, তবেই বাংলাদেশের কৃষি ও আবাসন খাতের বিদ্যমান সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। ড. মো. আলী আফজালের মতো ব্যক্তিত্বের হাত ধরেই বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে আধুনিক ও সমৃদ্ধ এক কৃষি-শিল্প অর্থনীতির দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এটাই আজ দেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা। তার এই কর্মময় জীবন যেন অনন্তকাল আমাদের প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে।





