একুশ শতক তথা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্রমাগত নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে কেবল মেধাবী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং সময়ের দাবি হলো ‘আর্থিকভাবে সচেতন’ হওয়া।
আমরা যখন ২০৩০ সালের মধ্যে একটি আধুনিক বাংলাদেশ বা ২০৪১ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরকে সেই লক্ষ্যপানে ঢেলে সাজানো জরুরি।
বিশেষ করে দেশের ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থা, যা আমাদের মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য প্রস্তুত করছে, সেখানে তাদের কি আমরা প্রকৃতপক্ষেই আগামির অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় রসদ জোগান দিতে পারছি?
ইংলিশ মিডিয়ামের প্রসার ও নতুন মেরুকরণ
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক ব্যাপ্তি ও প্রভাব বেড়েছে। এটি এখন আর কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক অভাবনীয় সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপ নিয়েছে। ফলে এই শিক্ষাব্যবস্থাটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের তথ্যচিত্র সেই পরিবর্তনেরই সাক্ষ্য দিচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১৯ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৮১ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী প্রচলিত বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার জনপ্রিয়তা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক দশকে এই ধারায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০ হাজারে উন্নীত হয়েছে।
বর্তমানে দেশব্যাপী সচল থাকা প্রায় ১৬৮টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মধ্যে ১২৭টিই রাজধানী ঢাকাভিত্তিক, যা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই কারিকুলামের প্রতি গভীর আগ্রহের অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এক সময় এই শিক্ষাব্যবস্থা ব্যয়বহুল হওয়ার তকমা থাকলেও শিক্ষার গুণগত মান এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মানচিত্রে নিজেদের স্থান সুসংহত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার তাড়নায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত এই ধারার প্রতি ঝুঁকছেন। কিন্তু এই উচ্চাভিলাষী পথচলার সমান্তরালে একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের প্রচলিত এই ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থা কি সন্তানদের আগামির জটিল ও বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকৃত অর্থে প্রস্তুত করছে?
চলমান পরিস্থিতি অবলোকনে প্রতীয়মান হচ্ছে যে ২০৪১ সালের লক্ষ্য অর্জনে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা বা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা লাভ করাটাই যথেষ্ট নয়। বরং আমাদের শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ‘আর্থিক সাক্ষরতা’ বা ‘ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি’ জ্ঞানের যে প্রকট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা এক বিশাল নীতিগত শূন্যস্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণ না করে কেবল উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা কতটুকু দেবে, তা আজ গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
কারিকুলাম ও বাস্তব জীবনের সংযোগ
বর্তমানে বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা প্রধানত ‘ক্যামব্রিজ অ্যাসেসমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন’ বা ‘পিয়ারসন এডেক্সেল’ কারিকুলাম অনুসরণ করে। ও-লেভেল এবং এ-লেভেল পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সাধারণত গণিত, ইংরেজি সাহিত্য ও ভাষা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি অর্থনীতি, ভূগোল, হিসাববিজ্ঞান এবং ব্যবসায় শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অধ্যয়ন করে।
এই পাঠ্যসূচি তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্লেষণী ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করে। তবে প্রশ্ন হলো, এই গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে বাস্তব জীবনের ‘লাইফ স্কিল’ বা ‘জীবনমুখী দক্ষতা’র প্রয়োগ কতটুকু?
কারণ, আমাদের দেশের কারিকুলামে স্ট্রিম অনুযায়ী এ-লেভেল পর্যন্ত অর্থনীতি বা হিসাববিজ্ঞান ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে থাকলেও একজন শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের জটিল সূত্র মুখস্থ করে ‘এ স্টার’ পেয়েও অনেক সময় নিজের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা, বাজেট তৈরি করা বা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে বুঝতে হিমশিম খায়।
‘আর্থিক সাক্ষরতা’—একটি অদৃশ্য অভাব
আর্থিক সাক্ষরতা (ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি) এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা (মানি ম্যানেজমেন্ট) কেবল কয়েকটি গাণিতিক সূত্রের সমষ্টি নয়; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বিষয়। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় সঞ্চয়ের অভ্যাস, বিনিয়োগের ঝুঁকি, মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব এবং ঋণের বোঝা ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো পাঠ্যবইয়ের পাতায় প্রায় অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যায় বা পেশাদার জীবনে প্রবেশ করে, তখন তারা বড় ধরনের আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট খায়।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন) আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক এজেন্ডা। এখনো আমাদের দেশের বাকি তিন কোটি মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় নিয়ে আসতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এবং সরকার যৌথভাবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছে।
কিন্তু এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত সূচনা হতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকে। যদি একজন শিক্ষার্থী স্কুলে থাকাকালীন ব্যাংকিং লেনদেন, ডিজিটাল ওয়ালেটের নিরাপদ ব্যবহার এবং বিমা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পায়, তবে জাতীয় পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে। তা না হলে আর্থিক সাক্ষরতাজ্ঞানের বাইরে থাকা দেশের ৭২ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত আর্থিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও কঠিন হয়ে পড়বে।
যেসব দেশে স্কুল পর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক, সেখানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুশৃঙ্খল সঞ্চয়ী হয়ে গড়ে ওঠার প্রবণতা অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কারিকুলামে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির রূপরেখা
আর্থিক সাক্ষরতাকে কেবল একটি অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে না দেখে এটিকে বিদ্যমান পাঠ্যসূচির সঙ্গে কার্যকর পদ্ধতিতে সমন্বিত করা প্রয়োজন, যেমন— ব্যবহারিক গণিত: গণিতের সমস্যাগুলোতে সেভিংস স্কিম, শেয়ারবাজার, কম্পাউন্ড ইন্টারেস্ট বা কর (ট্যাক্স) ক্যালকুলেশনের বাস্তব উদাহরণ যুক্ত করা।
স্কুল ব্যাংকিং: প্রতিটি স্কুলে ব্যাংকগুলোর সহযোগিতায় ‘স্কুল ব্যাংকিং উইন্ডো’র মাধ্যমে হাতে-কলমে সঞ্চয়ের শিক্ষা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ ‘স্টুডেন্ট ব্যাংকিং গাইডলাইনস’ একটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা: বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য কাল্পনিক বাজেট তৈরি বা ‘মক ইনভেস্টমেন্ট’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
ডিজিটাল ফাইন্যান্স: ফিনটেক এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রাথমিক ও নৈতিক ধারণা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। এ ছাড়া অনলাইন গেমের মাধ্যমে আর্থিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা।
পাশাপাশি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে তুলতে ডেটা সায়েন্স, এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার, গ্রিন ব্যাংকিং এবং ক্লাইমেট ফাইন্যান্সের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট জগতের মধ্যে বর্তমানে যে বিশাল দূরত্ব বিদ্যমান, তা ঘোচাতে পারে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন। আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইন্টার্নশিপ বা মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, কারিকুলাম পরিবর্তন বা পরিমার্জনের সময় যেন ইন্ডাস্ট্রি স্পেশালিস্টদের মতামত নেওয়া হয়। একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার বা সফল উদ্যোক্তা যখন শ্রেণিকক্ষে এসে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন, তখন শিক্ষার্থীরা বইয়ের থিওরির বাইরে বাস্তবের পাঠ পাবে। এটি শিক্ষার্থীদের কেবল একাডেমিক সাফল্যের পেছনে ছোটানো ‘গ্রেড-শিকারি’ না বানিয়ে একজন সচেতন ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।
পরিশেষে, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থাকে আমরা কেবল ‘বিদেশে যাওয়ার পাসপোর্ট’ হিসেবে না দেখে একে দেশের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। একইভাবে আর্থিক সাক্ষরতাকে কেবল অর্থের হিসাব করা নয়, এটিকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
যদি আমাদের শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকেই অর্থ ব্যবস্থাপনা শিখতে পারে, তবে তারা কেবল নিজেদের জীবন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখনই সময় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার। আগামির ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে হলে আমাদের সন্তানদের ‘আর্থিকভাবে স্মার্ট’ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






