পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কোরবানির পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবার সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাট বসবে। এরমধ্যে রাজধানীতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় মোট ২৭টি হাট নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কয়েকটি হাটে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় ১৬টি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটও রয়েছে। অধিকাংশ হাটের ইজারা কার্যক্রম চূড়ান্ত হয়েছে এবং ইজারাদারদের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, ঘোষিত ১১টি হাটের মধ্যে ৯টির ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। বাকি দুটি হাটের বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা চলছে। অন্যদিকে ডিএনসিসির আওতায় থাকা ১৬টি হাটের মধ্যে ১০টি অস্থায়ী ও একটি স্থায়ী হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। দক্ষিণ সিটিতে পোস্তগোলা, শাহজাহানপুর, আমুলিয়া, আফতাবনগর, শ্যামপুর, বনশ্রী ও গোলাপবাগ এলাকায় হাট হবে। উত্তর সিটিতে মিরপুর, কালশী, বাড্ডা, উত্তরা দিয়াবাড়ি, খিলক্ষেত, বনরূপা আবাসিক এলাকা ও বসুন্ধরা–সংলগ্ন এলাকায় পশুর হাট বসবে।
ডিএনসিসির ইজারা দেওয়া হাটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর উঠেছে উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকার হাটে। এ হাটের ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া বড় বেরাইদে বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গার হাট ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট–সংলগ্ন হাট ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির আরও যেসব হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মিরপুর সেকশন-৬–এর ইস্টার্ন হাউজিং–সংলগ্ন এলাকা, কালশী বালুর মাঠ, পূর্ব হাজীপাড়া, খিলক্ষেত মস্তুল চেকপোস্ট, বনরূপা আবাসিক প্রকল্প ও বাড্ডার স্বদেশ প্রপার্টিজ এলাকা।
তবে খিলক্ষেত বাজার–সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের এলাকা, মেরুল বাড্ডা, বছিলা, সুতিভোলা খাল–সংলগ্ন এলাকা, রানাভোলা ও মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। এসব হাটের জন্য পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন বলেন, ১০টি হাটের সর্বোচ্চ দরদাতাদের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি হাটগুলোর জন্য পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে ডিএসসিসির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর উঠেছে শিকদার মেডিকেল–সংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গার হাটে, যার ইজারা মূল্য ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া পোস্তগোলা শ্মশানঘাট–সংলগ্ন হাট ৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্প পর্যন্ত বিস্তৃত হাট ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর শাহজাহানপুর, আমুলিয়া মডেল টাউন, বনশ্রী, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব–সংলগ্ন এলাকা, গোলাপবাগ ও রহমতগঞ্জ এলাকায়ও হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে।
তবে সাদেক হোসেন খোকা খেলার মাঠ–সংলগ্ন এলাকা ও শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। এ দুই হাট পুনঃদরপত্রে দেওয়া হবে নাকি খাস আদায়ে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত ৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি দুটি হাটের বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের মতামত চাওয়া হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই এবার কোরবানির পশুর সম্পূর্ণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার ডিএনসিসির অডিটোরিয়ামে কোরবানির হাট ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত সভায় মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ দিনের জন্য পশুর হাট বসবে। এর আগে কোনো ধরনের বেচাকেনা বা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি বলেন, প্রায় ১০০ জন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবেন। বৈধভাবে ইজারা দেওয়া হাট ছাড়া অন্য কোথাও পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না।
ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ইজারাদাররা পশু বিক্রির অর্থ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হাসিল নিতে পারবেন। এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি হাট এলাকায় পানি জমতে না দেওয়া এবং প্রতিদিনের বর্জ্য প্রতিদিন অপসারণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় হাটে ‘পিংক টয়লেট’ স্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কোরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বড় হাটে পুলিশ ক্যাম্প, সিসিটিভি নজরদারি, ওয়াচ টাওয়ার ও ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম থাকবে। জাল টাকা শনাক্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় বিশেষ বুথ স্থাপন করা হবে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, যানজট নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে।
এদিকে প্রচলিত পশুর হাটের পাশাপাশি অনলাইন ও খামারভিত্তিক বিক্রিতেও আগ্রহ বাড়ছে। অনেক খামার মালিক ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পশু বিক্রি করছেন। ক্রেতারা অনলাইনে পশুর ছবি, ভিডিও, ওজন ও খাদ্যতালিকা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।
খামারিরা বলছেন, সরাসরি খামার থেকে পশু কিনলে ভিড় এড়ানোর পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। তবে পরিবহন পথে চাঁদাবাজি, হাটে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য ও জাল টাকার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাঁদের মধ্যে।
এসব অভিযোগ ঠেকাতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মহাসড়ক, ফেরিঘাট ও পশুর হাটে পুলিশ, র্যাব ও হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এবার কোরবানির পশুর হাট হবে চাঁদাবাজিমুক্ত, নিরাপদ ও উৎসবমুখর।






