বিশ্ব অর্থনীতির নতুন শক্তির নাম এখন সেমিকন্ডাক্টর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে স্মার্টফোন, যুদ্ধবিমান থেকে মেডিকেল ডিভাইস প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে প্রতিটি আধুনিক যন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষুদ্র এক চিপ। যে দেশ এই চিপ ডিজাইন ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আগামী বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবও অনেকাংশে তার হাতেই থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ, তাইওয়ান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতা আজ শুধু বাণিজ্যের নয়, এটি প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াইও। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশ থেকেও ধীরে ধীরে উঠে আসছে এক নতুন সম্ভাবনার গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ উল্কাসেমির প্রতিষ্ঠাতা, সিইও ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান।
সম্প্রতি তিনি আবারও সম্মানজনক ‘কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (সিআইপি-এনআরবি) ২০২৬’ সম্মাননা অর্জন করেছেন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বৈধ পথে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর স্বীকৃতি হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তাকে এই সম্মাননা দেয়।
মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানের গল্প শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো কোনো সফল প্রবাসী উদ্যোক্তার গল্প নয়। বরং এটি এমন এক বাংলাদেশির গল্প, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তিখাতগুলোর একটিতে বাংলাদেশের উপস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছেন। যখন দেশের অধিকাংশ তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি খাত বলতে সফটওয়্যার বা আউটসোর্সিং বুঝতেন, তখন তিনি কথা বলেছেন ভিএলএসআই, আইসি ডিজাইন, সেমিকন্ডাক্টর আর্কিটেকচার এবং চিপ ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। তার প্রতিষ্ঠান উল্কাসেমি আজ বাংলাদেশের প্রথম সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন কোম্পানি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছে।
বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর খাত এখনও অনেকের কাছে নতুন শব্দ। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যে এই শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই শিল্পের আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, স্মার্ট মেডিকেল ডিভাইস এবং ডিফেন্স টেকনোলজির বিস্তার এই খাতের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে দক্ষ জনশক্তির জন্য বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। মালয়েশিয়া ৬০ হাজার, ভারত ৩ লাখ এবং ভিয়েতনাম ৫০ হাজার সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশও সুযোগ দেখতে শুরু করেছে।
মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশ চাইলে এই বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অংশ হতে পারে। তবে এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। তার ভাষায়, সেমিকন্ডাক্টর মূলত একটি ‘নলেজ ইন্ডাস্ট্রি’। এখানে বড় কারখানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ মেধা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। সেই লক্ষ্য নিয়েই উল্কাসেমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। গত ১৮ বছরে প্রতিষ্ঠানটি বহু প্রকৌশলী তৈরি করেছে, যারা দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বর্তমানে উল্কাসেমিতে প্রায় ৫৭০ জন কর্মী কাজ করছেন। ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে
সেমিকন্ডাক্টর খাতে ৫ হাজার প্রকৌশলীর কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। শুধু কর্মসংস্থান নয়, তিনি বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে একটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের খাতে পরিণত করার স্বপ্নও দেখছেন।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবশ্য দক্ষ জনশক্তি। বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিএলএসআই কোর্স থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বইভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সেই পাঠ্যক্রমের ফারাক এখনও অনেক। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে উল্কাসেমি নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং, সেমিনার, ব্লগ, কনফারেন্স, ভিএলএসআই প্রতিযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের এই খাতে আগ্রহী করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে যে প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর কথা জানানো হয়েছে, সেখানে প্রথম পর্যায়ে আইসি লেআউট ডিজাইন, আইসি ফিজিক্যাল ডিজাইন এবং সার্কিট ডিজাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষক হিসেবে থাকবেন উল্কাসেমির অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা।
মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। তার মতে, দেশের ছেলেমেয়েরা খুব দ্রুত নতুন প্রযুক্তি শিখে নিতে পারে। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে বহু বাংলাদেশি কাজ করছেন। ইন্টেল, অ্যাপলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের উপস্থিতি সেই সম্ভাবনারই প্রমাণ। তার বিশ্বাস, সঠিক পরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ দেওয়া গেলে বাংলাদেশও দক্ষ সেমিকন্ডাক্টর জনশক্তির কেন্দ্র হতে পারে।
তবে এই শিল্পের বিকাশ কেবল একটি কোম্পানির উদ্যোগে সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতি সহায়তা, আন্তর্জাতিক সংযোগ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সেই কারণেই ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। সেখানে একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সদস্য হিসেবে যুক্ত হন মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানও। বুয়েট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও এমআইএসটির শিক্ষকদের পাশাপাশি শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্স বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সেমিকন্ডাক্টর নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২৫-এও সেমিকন্ডাক্টরকে দেশের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ বক্তা হিসেবে অংশ নেন মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। তার মতে, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে জায়গা করে নিতে হলে এখনই কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে ব্যবসা সহজীকরণ, কাস্টমস জটিলতা কমানো এবং প্রযুক্তিখাতের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি এই জটিলতার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাকে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইনি ও বীমা কাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার বিদেশ থেকে প্রযুক্তি সরঞ্জাম আনতে গিয়ে প্রশাসনিক জটিলতার মুখেও পড়তে হয়। তার মতে, অনেক সমস্যাই খুব সহজে সমাধানযোগ্য, কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে উদ্যোক্তারা ভোগান্তিতে পড়েন।
তবুও আশাবাদ হারাননি তিনি। বরং বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা এবং তরুণ সমাজের সক্ষমতাকেই তিনি সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখেন। তার মতে, “অপটিমিজম ছাড়া তো আমরা চলতে পারব না।” এই আশাবাদ থেকেই তিনি ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত রাউন্ডটেবিল আলোচনাতেও অংশ নেন মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, সৌদি আরব এখন তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতে তাদের আগ্রহ বাড়ছে। উল্কাসেমির অফিস সফর করে সৌদি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সক্ষমতা দেখে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।
সেই আলোচনায় তিনি একটি মেডিকেল ডিভাইস প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন। উল্কাসেমি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এমন একটি কম খরচের ইসিজি ডিভাইস তৈরি করছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রোগীর অবস্থা বিশ্লেষণ করতে পারবে। তার মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি শুধু ব্যবসায়িক সম্ভাবনাই নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আজকের বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর শুধু প্রযুক্তিখাত নয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতিরও অংশ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, সরবরাহ চেইন সংকট কিংবা প্রযুক্তিনিষেধাজ্ঞা—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে চিপ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি সময়মতো নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রযুক্তি অর্থনীতিতে একটি জায়গা করে নেওয়া অসম্ভব নয়।
মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানের গল্প তাই কেবল একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের সম্ভাবনার গল্প। এমন এক বাংলাদেশের গল্প, যে দেশ শুধু শ্রম রপ্তানি বা তৈরি পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং উচ্চপ্রযুক্তির বিশ্বেও নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়। উল্কাসেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সেই স্বপ্নেরই প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণ করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স এখনও বড় শক্তি। কিন্তু ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর। সেই ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ কতটা দ্রুত এগোতে পারবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে এমন উদ্যোগগুলোর ওপর। আর সেই যাত্রাপথে মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানদের মতো মানুষদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাত নিয়ে আলোচনা হলে দীর্ঘদিন ধরে সফটওয়্যার আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টই ছিল মূল আলোচনার কেন্দ্র। কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সেই অর্থে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। এখানে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রমঘন নয়, বরং ইনফরমেশন বেজড। একটি চিপ ডিজাইনের পেছনে যেমন উচ্চমানের গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশল জ্ঞান প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, ধৈর্য এবং আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার সংস্কৃতি। ফলে এই খাতে প্রবেশ করা যেমন কঠিন, সফল হওয়াও তেমনি চ্যালেঞ্জিং। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশে বসে আন্তর্জাতিক বাজারে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিস দেওয়া নিজেই এক বড় অর্জন।
উল্কাসেমির যাত্রাপথও সহজ ছিল না। শুরুতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের বোঝাতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। কারণ বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশ তখনও সেমিকন্ডাক্টর মানচিত্রের কোনো পরিচিত নাম নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে দক্ষতা, সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। আজ উল্কাসেমির কার্যক্রম বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। নতুন করে জার্মানি, জাপান ও সৌদি আরবেও কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কোথায়? মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনসংখ্যা। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই প্রযুক্তিখাতে দক্ষ মানবসম্পদের সংকট দেখা দিচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ দ্রুত প্রযুক্তি শেখার সক্ষমতা রাখে। যদি তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ কম খরচে উচ্চমানের প্রযুক্তি সেবা দিতে পারবে। ভারতের আইটি বিপ্লবও একসময় এমন মানবসম্পদভিত্তিক মডেলের ওপর দাঁড়িয়েই তৈরি হয়েছিল।
রাউন্ডটেবিল আলোচনায় তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তার মতে, সেমিকন্ডাক্টর শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি কৌশলগত খাতও। ভবিষ্যতের সাইবার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এই খাতে বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের অর্থনীতি এখনও সীমিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিখাত সেই বৈচিত্র্যের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে কর্মরত একজন দক্ষ প্রকৌশলী যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারেন, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত খাতগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে এই শিল্প শুধু প্রযুক্তিগত মর্যাদা নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়াতে পারে।
আজ থেকে এক দশক আগেও বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় খুব কমই কথা হতো। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে সেই বাস্তবতা। তরুণ উদ্যোক্তা, আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশলী এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলো দেখাচ্ছে—বাংলাদেশ শুধু শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবেই থাকতে চায় না। বরং প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চায়।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথ এখনও শুরুর পর্যায়ে। সামনে রয়েছে নীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বহু চ্যালেঞ্জ। তবুও বাংলাদেশের প্রযুক্তি ইতিহাসে উল্কাসেমি এবং মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান–এর নাম ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। কারণ তারা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের মেধা চাইলে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তিখাতেও জায়গা করে নিতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাই হয়তো ভবিষ্যতের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।






