গ্রিন কার্ডের নতুন নীতি: যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে ভারতীয়রা | চ্যানেল আই অনলাইন

গ্রিন কার্ডের নতুন নীতি: যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে ভারতীয়রা | চ্যানেল আই অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িক ভিসায় অবস্থানরত বিদেশিদের স্থায়ী বসবাস বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার নিয়মে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কড়াকড়িতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে যাচ্ছেন ভারতীয় প্রবাসীরা।

নতুন এই নীতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসে স্ট্যাটাস পরিবর্তন (অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস) করার সুযোগ বাতিল করে নিজ দেশে ফিরে কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই নিয়মের ফলে অন্য যে কোনো দেশের নাগরিকদের তুলনায় ভারতীয়রা সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

ভারতীয়দের জন্য পরিস্থিতি কেন এত ভয়াবহ, এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা:

শত বছরের অপেক্ষা ও কোটা ব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে এমপ্লয়মেন্ট-বেসড গ্রিন কার্ডের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের জন্য ৭ শতাংশের একটি নির্দিষ্ট কোটা (প্রতি-দেশের ক্যাপ) রয়েছে। দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করলেও এই কোটার কারণে তাদের জন্য বিশাল এক জট বা ব্যাকলগ তৈরি হয়েছে। অনেক ভারতীয়র জন্য এই অপেক্ষার প্রহর ১০০ বছর ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এখন এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর চূড়ান্ত ধাপে তাদের যদি ভারতে ফিরে গিয়ে আবেদন করতে হয়, তবে তা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অবাস্তব লজিস্টিক বাধা তৈরি করবে।

এইচ-১বি ভিসা এবং চাকরি হারানোর চরম ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত দক্ষ ভারতীয় পেশাজীবীদের বড় অংশই এইচ-১বি ভিসায় কাজ করছেন। নতুন নিয়মে তাদের যদি ভারতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ইন্টারভিউয়ের জন্য যেতে হয়, তবে তারা ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসেসিং’ বা ২২১(জি)-এর দীর্ঘসূত্রতার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। কোনো কারণে ভিসা প্রসেসিংয়ে কয়েক সপ্তাহ, মাস বা বছর দেরি হলে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের চাকরিটি হারাতে হতে পারে। আর চাকরি হারালে তাদের স্পন্সরশিপ এবং গ্রিন কার্ডের মূল আবেদনটিও পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কা ও ‘ডকুমেন্টেড ড্রিমার’

দীর্ঘ এই প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ভারতীয় পরিবারের সন্তানের বয়স ২১ বছর পার হয়ে যায়, যার ফলে তারা নির্ভরশীল ভিসার আইনি যোগ্যতা হারায়। এই শিশুদের ‘ডকুমেন্টেড ড্রিমার’ বলা হয়। আগে যুক্তরাষ্ট্রে বসে স্ট্যাটাস পরিবর্তনের সময় কিছু আইনি সুরক্ষা পাওয়া যেত (যেমন সিএসপিএ), যা পরিবারগুলোকে একসঙ্গে থাকতে সাহায্য করত। কিন্তু এখন সপরিবারে ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য হলে অনেক পরিবার চিরতরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

কনস্যুলেট ব্যবস্থার ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ

ভারতে অবস্থিত মার্কিন মিশনগুলো (নয়াদিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ এবং কলকাতা) এমনিতেই সাধারণ ভিজিটর ও স্টুডেন্ট ভিসার চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। এখন হঠাৎ করে লাখ লাখ জটিল, এমপ্লয়মেন্ট-বেসড গ্রিন কার্ডের ইন্টারভিউ এই কনস্যুলেটগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। একটি ইন্টারভিউয়ের তারিখ পেতেই ভারতীয়দের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে অশনিসংকেত

ভারতীয় পেশাজীবীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং চিকিৎসা খাতের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি। শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এবং কর্পোরেট আইনজীবীদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলী বা গবেষকরা যদি কনস্যুলার প্রক্রিয়ার কারণে ভারতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে পড়েন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়বে।

মানবাধিকার কর্মী ও অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এই নীতি এমনিতেই ত্রুটিপূর্ণ একটি ব্যবস্থাকে ভারতীয়দের জন্য আক্ষরিক অর্থেই বিপজ্জনক করে তুলেছে। এর ফলে তাদের পেশাজীবন, পরিবার এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অচিরেই এই বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে আদালতে বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু হবে।