আইরিন খানের নিয়োগকে স্বাগত জানাই

আইরিন খানের নিয়োগকে স্বাগত জানাই

ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তারেক রহমান বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সব কটি যে নীতিগত সিদ্ধান্ত, তা নয়; কোনো কোনোটি রাজনীতির ভাষায়, নিছক লোকদেখানো বা পারফরম্যাটিভ। অফিসে যাওয়ার পথে ধানের শিষ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের কাছে উপহার পাঠানো, বিলবোর্ডে নিজের বা পরিবারের কারও ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা বা শিশুদের সঙ্গে সেলফি তোলা—এসবই পারফরম্যাটিভ, কিন্তু লোকপ্রিয়তার বাটখারায় বিশাল।

একাধিক রাজনৈতিক মিটিংয়ে তারেক রহমান সাধারণ নাগরিকদের ডেকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব করেছেন হয়তো হাততালির জন্য, কিন্তু মানুষ তা পছন্দ করেছে।

কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তও মানুষের নজরে পড়েছে। অভাবী মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত বরাদ্দ, মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কঠোর নজরদারি ইত্যাদি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে না গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনে গেছেন, তা–ও কোনো কোনো মহলে প্রশংসিত হয়েছে।

আইরিন খানের নিয়োগ কেন গুরুত্বপূর্ণ

কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বের দিক দিকে মোটেই সামান্য নয়—এমন একটি সিদ্ধান্ত হলো জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের নিয়োগ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একজন নিকটাত্মীয়, এটি শুধু একটি কাকতালীয় ব্যাপার, তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।

মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আইরিন খান আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। প্রথমে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব ও পরে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল ফার্মের প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি সুপরিচিত।

এক দশক আগে জাতিসংঘে তাঁর ভাষণ শুনেছি। কানায় কানায় ভরা হলে তিনি একটানা প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেছিলেন। দারুণ লেগেছিল, খুব গর্বও হয়েছিল। ২০২০ সালে তাঁকে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক বা র‍্যাপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, বিশ্বের ১২টি আন্তর্জাতিক নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা যৌথভাবে এক বিবৃতিতে সে নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিল। তাদের মোদ্দা বক্তব্য ছিল, তাঁর মতো একজন ব্যক্তিকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় বাক্‌স্বাধীনতা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর জবাবদিহি বাড়বে, এমন বিশ্বাস তাঁদের রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অথবা তারেক রহমানের নতুন সরকারের সময়, অবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে, সে কথাও কেউ বলেনি। মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার নিয়ে যখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়ে একজন প্রকৃত মানবাধিকারকর্মীকে জাতিসংঘে তার স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়ে তারেক রহমান সরকার সাহসের পরিচয় দিয়েছে।

এমন আরও অনেক কারণেই আমরা স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খানের চলতি নিয়োগকে স্বাগত জানাই। এই নিয়োগে আইরিন খানের বাড়তি কী লাভ হবে জানি না, কিন্তু কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিস্তর লাভ হবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘ভিজিবিলিটি’ বা দৃশ্যমানতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন বাক্‌স্বাধীনতা প্রশ্নে আইরিন খানের বক্তব্য বিশ্বের মিডিয়া আগ্রহ নিয়ে শুনেছে। এখন বাংলাদেশ বা অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রশ্নে তিনি দুকথা বললে পৃথিবীর মিডিয়া তা আগ্রহ নিয়ে শুনবে, তা ভাবা অযৌক্তিক নয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ‘ভিজিবিলিটি’ বাড়লে বাংলাদেশেরও ভিজিবিলিটি বাড়বে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার

শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশে মানবাধিকারের অবনতি ঘটেছে, এটা কোনো গোপন কথা নয়। বেশুমার গুম-খুন ও রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, ত্রুটিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন, প্রশাসনের দলীয়করণ, বিচারব্যবস্থার অব্যবস্থা, সর্বোপরি ২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লবের সময় অভাবিত গণহারে হত্যা—এসব নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের তরফ থেকেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অথবা তারেক রহমানের নতুন সরকারের সময়, অবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে, সে কথাও কেউ বলেনি। মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার নিয়ে যখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়ে একজন প্রকৃত মানবাধিকারকর্মীকে জাতিসংঘে তার স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়ে তারেক রহমান সরকার সাহসের পরিচয় দিয়েছে।

অ্যামনেস্টির মহাসচিব থাকাকালীন আইরিন খান নানা সময়ে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেভাবে সংকুচিত হয়ে এসেছে, তার নিন্দা করেছেন। আওয়ামী সরকারের অধীন র‍্যাবের মাধ্যমে যেভাবে বেপরোয়া গুম-খুন চলেছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন আইরিন। তিনি বলেছিলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য র‍্যাব ও সেনাবাহিনীকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও জাতিসংঘের মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার হিসেবে তিনি সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ প্রশ্নে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ডেইলি স্টার পত্রিকার ওপর মব হামলার পর তাঁর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘এই মব আক্রমণগুলো হাওয়া থেকে ঘটেনি, বরং বিচারহীনতা দূর করা এবং সংবাদমাধ্যম ও শিল্প-সাহিত্যের স্বাধীনতা বজায় রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কারণেই এগুলো ঘটেছে।’

আইরিন খান

জাতিসংঘের কাছে আমাদের প্রত্যাশা

ক্ষমতার বাইরে থেকে একজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আইরিন খান যে কথা বলেছেন, এখন ক্ষমতাবলয়ের ভেতর থেকেও কি সে কথা বলতে পারবেন? সেটাই হবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার সেরা পরীক্ষা। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর একটি কাজ হবে এই সরকারের কার্যাবলির সপক্ষে বক্তব্য তুলে ধরা। মানবাধিকার, বিশেষত তথ্য স্বাধীনতা প্রশ্নে আমাদের কোনো সরকারের রেকর্ডই খুব ভালো নয়।

আইরিন একসময় যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোর সমালোচনা করেছেন, বর্তমান সরকার সে আইন বদলে সাইবার সুরক্ষা আইন জারি করেছে। নাম বদলালেও এই দুই আইনের কাজ এক, তার অপব্যবহারও অভিন্ন।

এ বছর এপ্রিলে ঢাকায় এক সেমিনারে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ প্রতিনিধি মন্তব্য করেছিলেন, সাইবার নিরাপত্তার নামে সরকার নতুন যে তিনটি আইন জারি করেছে, নাম যা–ই হোক না, কাজের বেলায় আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে তারা খুব ভিন্ন নয়। ফেসবুকে কে কী লিখল, তা নিয়ে এখনো আগের মতোই মামলা চলছে, জেল-জুলুমের ঘটনাও উধাও হয়নি।

দেখার বিষয় হবে জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে আইরিন খান এই চাতুরীর মোকাবিলা কীভাবে করেন।

জাতিসংঘের কাছে আমাদের চাওয়ার হয়তো অনেক কিছু আছে, কিন্তু কঠিন সত্য হলো তার কাছ থেকে পাওয়ার খুব বেশি কিছু নেই। রোহিঙ্গা প্রশ্নে আমরা যে রকম গেরোয় পড়ে আছি, তা থেকেই স্পষ্ট নামে জাতিসংঘ হলেও সে আসলে ঠুঁটো জগন্নাথ। কাগজে-কলমে তার প্রধান দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দেখছি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার কোনো প্রশ্নেই তার কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। ‘বড় পাঁচ’ কর্তারা যা বলে, সেটাই শেষ কথা।

তবে ঠুঁটো হলেও সে জগন্নাথ, বিশেষত বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এখনো জাতিসংঘ আমাদের শ্রেষ্ঠ সহায়। অন্ততপক্ষে দুটি প্রশ্নে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে তার পাশে চায়। এর একটি রোহিঙ্গা সংকট, অন্যটি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা। মিয়ানমার বা ভারতকে এড়িয়ে এই দুই প্রশ্নের সমাধান সম্ভব নয়, কিন্তু জাতিসংঘের মাধ্যমে এই দুই দেশের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায়ও আমরা জাতিসংঘকে একজন অভিভাবক হিসেবে পেতে চাই।

কাকতালীয় হলেও বাংলাদেশের জন্য এই সময়ের একটি বাড়তি সম্মান এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি অবশ্য বাংলাদেশের নয়, বিশ্বসভার প্রতিনিধিত্ব করবেন। তা হলেও যতবার সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে, তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের নামটিও উচ্চারিত হবে।

ঠিক এ সময় আইরিন খানের মতো একজন মানবাধিকার নেত্রীর জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ তুলনাহীন দৃশ্যমানতার সুযোগ সৃষ্টি করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

  • হাসান ফেরদৌস সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব