
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন বাংলাদেশি তরুণ চিকিৎসক ডা. অদিতি সাহা অনন্যা। অদিতির গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায়। তিনি বাবুল সাহার একমাত্র কন্যা। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই ছিল মা-বাবার অসংখ্য আশা। মেয়ের চিকিৎসক হয়ে ওঠা এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ছিল তাঁদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবারটিকে এখন মুখোমুখি হতে হলো অপূরণীয় এক শোকের। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান, সময় ও কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অদিতি সাহা অনন্যার স্বপ্নের সীমানা শুধু এমবিবিএস ডিগ্রিতে থেমে ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নত পরিবেশে নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে, রোগীর পাশে দাঁড়াতে এবং একদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে। সেই লক্ষ্যেই পাড়ি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কঠিন পরীক্ষা, দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অনিশ্চয়তার অসংখ্য ধাপ পেরিয়ে চলতি জুলাই মাসে ইন্টারনাল মেডিসিনে রেসিডেন্সি শুরু করেছিলেন তিনি।
অদিতির শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে ঢাকায়। তিনি রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং কেম্ব্রিয়ান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর জহিরুল হক শিকদার উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন। দীর্ঘ ও পরিশ্রমসাধ্য চিকিৎসাশিক্ষা শেষে সেখান থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
বাংলাদেশে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর অদিতি যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক হিসেবে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন। ইউনাইটেড স্টেটস মেডিক্যাল লাইসেন্সিং এক্সামিনেশনের প্রয়োজনীয় ধাপ সম্পন্ন করার পাশাপাশি দেশটির চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ক্লিনিক্যাল রোটেশনে অংশ নেন। কয়েক বছরের প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতামূলক বাছাইপ্রক্রিয়া পেরিয়ে তিনি ইন্টারনাল মেডিসিন রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে ম্যাচ করেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর চিকিৎসা প্রশিক্ষণের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণের সুযোগ পান তিনি।
বাংলাদেশের কোনো মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রে রেসিডেন্সিতে সুযোগ পাওয়া সহজ নয়। একজন বিদেশি মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েটকে ইউএসএমএলইয়ের প্রয়োজনীয় ধাপ অতিক্রমের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা অর্জন, সুপারিশপত্র সংগ্রহ এবং একাধিক সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এরপর বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি আবেদনকারীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে ম্যাচ করতে হয়। অদিতির এই অর্জনের পেছনেও ছিল কয়েক বছরের প্রস্তুতি, ধৈর্য ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ও ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা কলেজ অব মেডিসিনের শিক্ষক ডা. বি এম আতীকুজ্জামান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অদিতিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের মে মাসে অদিতি তাঁর তত্ত্বাবধানে ক্লিনিক্যাল রোটেশনে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে কাজ করার সময় অদিতির শেখার আগ্রহ, দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত নিষ্ঠা কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি।
অদিতি ইন্টারনাল মেডিসিন রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে ম্যাচ করার পর তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ডা. আতীকুজ্জামান। সেটিই ছিল তাঁদের শেষ যোগাযোগ। মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তিনি লেখেন, ব্যস্ত কর্মদিবসের মধ্যেও খবরটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁর স্মৃতিতে অদিতি ছিলেন নিজের স্বপ্নপূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক তরুণ চিকিৎসক।
অদিতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত স্বজন, সহপাঠী ও চিকিৎসকদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত শোকবার্তাগুলোতে উঠে এসেছে তাঁর নিষ্ঠা, মানবিকতা এবং চিকিৎসক হিসেবে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে যে তরুণী চিকিৎসক নতুন কর্মজীবনের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলেন, তাঁর আকস্মিক মৃত্যু এখন পরিবার ও পরিচিতজনদের কাছে এক গভীর বেদনার স্মৃতি।
এনএন/ ২৯ জুলাই ২০২৬






