চলচ্চিত্র আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, শিক্ষা, ইতিহাস, সমাজ ও মানবজীবনের প্রতিচ্ছবিও বটে। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, পরিচালক, প্রযোজক, সংগীত পরিচালক, কণ্ঠশিল্পী ও অভিনয়শিল্পী- সবার অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় সিনেমাই ছিল মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। ষাট ও সত্তরের দশকে সাদা-কালো চলচ্চিত্রের ছিল স্বর্ণযুগ। তখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। রেডিও কিংবা সিনেমার পোস্টার দেখে মানুষ জানতে পারত, কোন হলে কোন ছবি মুক্তি পাচ্ছে। সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল উৎসবের মতো।
শৈশবে প্রতিবেশীর বাড়িতে টেলিভিশনে ‘পিচ ঢালা পথ’ দেখার অভিজ্ঞতা আজও মনে পড়ে। ঝিরঝিরে পর্দায় ছবির গল্প তেমন বোঝা না গেলেও গান, সংলাপ আর দৃশ্য কৌতূহল জাগিয়েছিল। সেই কৌতূহলই ছিল শেখার প্রথম ধাপ। যদিও একসময় সমাজের একটি অংশ সিনেমাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখত, মনে করতো- সিনেমা দেখলে ছেলে মেয়ে নষ্ট হয়ে যাবে! তবু চলচ্চিত্র আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অসংখ্য গুণী শিল্পী তাঁদের অভিনয় দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। রূপবানের সুজাতা, কুচবরণ কন্যার সুচন্দা, দেবদাসের পার্বতী চরিত্রে কবরী কিংবা ‘অবুঝ মন’-এ শাবানার অনবদ্য অভিনয় আজও স্মরণীয়। দর্শকের ভালোবাসায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল রাজ্জাক-কবরী, সুজাতা-আজিম, শাবানা-আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পাসহ বহু জুটি। পাশাপাশি আনোয়ারা, রোজী সামাদ, সুচরিতা, নূতন, সুলতানা, রোজিনা, অঞ্জনা, আনোয়ার হোসেন, গোলাম মোস্তফা ও বুলবুল আহমেদের মতো শিল্পীরাও বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।
এই নক্ষত্রমালার মধ্যেও উজ্জ্বল এক নাম ববিতা। ফারুক-ববিতা জুটি যেমন দর্শকের হৃদয় জয় করেছে, তেমনি একক অভিনেত্রী হিসেবেও তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব এক উচ্চতা। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সিনেমার অসংখ্য কালজয়ী গান। ‘অনন্ত প্রেম’-এর ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই…’, ‘অবুঝ হৃদয়’-এর ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন…’, ‘পিচ ঢালা পথ’-এর ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়…’, কিংবা ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে…’- এসব গান আজও দর্শকের হৃদয়ে অমলিন।
‘বাঁদী থেকে বেগম’ ছবিতে তার সংলাপ- “বাঁদী থেকে বেগম হলাম, কিন্তু আমি কী পেলাম” আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘হাছন রাজা’, ‘মিস লঙ্কা’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘আলোর মিছিল’, ‘লাঠিয়াল’, ‘প্রিয়তমা’, ‘মানুষের মন’ ও ‘বসুন্ধরা’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি নিজেকে বারবার নতুনভাবে তুলে ধরেছেন।
সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রেও ছিল তার সমান সাফল্য। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রামের সুমতি’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে তার মমতাময়ী চরিত্র দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষবৃক্ষ’ অবলম্বনে নির্মিত ‘বিরহ ব্যথা’ চলচ্চিত্রেও তার অভিনয় ছিল প্রশংসিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার বড় বোন সুচন্দাও বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং ছোট বোন চম্পাও অভিনয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন।
অভিনয়জীবনে ববিতা অর্জন করেছেন অসংখ্য সম্মাননা। টানা ১৯৭৫, ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে, পরে ১৯৮৫ ও ১৯৯৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করে। সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রে অনন্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন একুশে পদক।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ববিতা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববরেণ্য নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন। তার এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের রিচার্ডসন সিটির মেয়র ৫ আগস্টকে ‘ববিতা ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই যশোরে জন্ম নেওয়া ববিতা আজও বাংলা চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তী। বয়স তার কাছে কেবল একটি সংখ্যা। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং অবদানের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য নক্ষত্র, যার আলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
৭৩ বছর বয়সের অভিনেত্রী ববিতা চির সবুজ জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে আছেন সবার মাঝে। তিনি অনন্যা ববিতা। ‘আকাশেতে লক্ষ তারা চাঁদ কিন্তু একটাই রে…’।





