দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিজস্ব নির্মাণভাষা দিয়ে আলোচিত মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ব্যাচেলর, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, ডুব ও শনিবার বিকেল–এর মতো আলোচিত সিনেমার এই নির্মাতা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। তার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণের কাজ, যার বড় অংশ শেষ হয় তার দায়িত্বকালেই। সম্প্রতি জাদুঘরটির উদ্বোধনের পর চ্যানেল আইয়ের মুখোমুখি হয়ে ফারুকী কথা বলেছেন জাদুঘরের নেপথ্যের গল্প, জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি, সেনাপ্রধানের বক্তব্যে তার চলচ্চিত্রের গানের প্রসঙ্গ, দেশ ছাড়ার গুঞ্জন, চলচ্চিত্রে ফেরার পরিকল্পনা, ‘ব্যাচেলর’-এর চেয়েও সাহসী সিনেমা নির্মাণের ইঙ্গিতসহ সাম্প্রতিক নানা আলোচিত বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন লায়লা নওশিন:
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনানিবাসের এক জরুরী বৈঠকে সেনাপ্রধান পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় দুটি গানের উল্লেখ করেছিলেন। যার একটি আপনার ‘ব্যাচেলর’ সিনেমার গান। প্রেক্ষাপটটা কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
আমিও আপনার মতই এটা সোশ্যাল মিডিয়া বা লোকমুখে শুনেছি যে ৩ তারিখ দরবারে সেনাপ্রধান দুইটা গানের রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন। একটা হচ্ছে ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি। প্রেম আমার উপরে পড়েছে।’ আমাদের ‘ব্যাচেলর’ ছবির আরেকটা হচ্ছে ‘আরো বেশি কাঁদালে উড়াল দিব আকাশে।’ যেটা বুঝতে পারি যে উনি উনার যে জটিল অবস্থাটার মধ্যে উনি তখন পড়েছেন, অ্যাজ এ লিডার অ্যান্ড অলসো সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ, পুরো দেশ যে একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে; এটা বোঝানোর জন্য উনি এই দুইটা গানের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা আমি এখানে বলতে চাই। এটা স্বীকার করাই উচিত ২৫ তারিখের পর থেকেই আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের দিকে কান পেতে থাকতাম বোঝার জন্য যে ওখানে কী হচ্ছে? মুভমেন্টটা কী হচ্ছে? কারণ ইতিমধ্যে আমরা জানি যে শত শত মানুষ জীবন দিয়েছে। ছাত্র, শ্রমিক, কিশোর, বিভিন্ন পেশার মানুষজন জীবন দিয়েছে এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ ছাড়া এত মানুষ প্রাণ হারানোর ঘটনা এই ভূখণ্ডে এই ১০০ বছরে ঘটেনি। ফলে এইটা কখন থামবে এটা বোঝার জন্য আমি মনে করি শুধু আমি নই, আমাদের মত অনেকেই এ বিষয়ে নজর রাখার চেষ্টা করত যে ক্যান্টনমেন্টে কী হচ্ছে?
৩ তারিখের দরবার মানুষকে একটা আশ্বস্ত করে যে সেনাবাহিনী জনগণের পাশেই থাকবে এবং তারপরে তো তারা পরিষ্কার তাদের অবস্থান জানায় যে, জনগণের দিকে তাদের অবস্থান থাকবে। আমি মনে করি দে আর আনসাং হিরোস। তাদের কথা আমরা বলি না। আমাদের অনেক হিরো আছে এই চব্বিশে। যেরকম অনেক ব্যাপক একটা বড় গণঅভ্যুত্থান এর হিরোর সংখ্যাও প্রচুর। নানামুখী, দেশের, দেশের বাইরের মানুষরাও। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী এবং সেনাপ্রধান তাদের কথাটাও আমি মনে করি বলা প্রাসঙ্গিক। দে আর আনসাং হিরো। দে আর হিরোস টু।
আর গান দুইটার অর্থ দেখলে- গান দুইটা যদি আমরা শুনি তাহলে তো বুঝতে পারি যে উনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন যে আমি তো ঝামেলার মধ্যে গিয়ে পড়তে চাই না। ঝামেলা এসে আমার উপর পড়েছে। আমার মানে বাংলাদেশের উপরে সওয়ার হয়েছে ঝামেলাটা। আমার বলতে আমি সেনাপ্রধানের কথা বলছি। ‘আরো বেশি কাঁদালে উড়াল দিব আকাশে’- এগুলো তো হচ্ছে তার ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক যে ফ্রাস্ট্রেশনটা, যে হতাশার মধ্যে পড়েছে এবং এটা সামষ্টিকভাবে বাংলাদেশেরই হতাশা ছিল। উনি সেটাকে ইঙ্গিত করেছেন। এটা তো বোঝা যাচ্ছে গান দুইটা সিলেকশনের মধ্য দিয়ে।
কিছুদিন আগে সবাই বলছিল যে মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন?
এটা নিয়ে আমার কোন কিছু বলার নাই। দেখেন, আমি সরকারে যাওয়ার পরে, আমার আর তো এমনিতে আগেও প্রাইভেট লাইফ ছিল না। যে কাজ করি সে কাজের কারণে সরকারে যাওয়ার পরে কিছু মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়েছি। ক্ষোভের শিকার হয়েছি। ফলে তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা তাদের মত কথা বলেছে। এটার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। কারণ ইমিগ্রেশন পার করে যে মানুষ দেশের বাইরে যায়, সে পালিয়ে যায় কীভাবে? পালিয়ে যায় হচ্ছে সে যে ইমিগ্রেশন দিয়ে যায় না, যে অন্যভাবে যায়। যে ইমিগ্রেশন পার করে যায় আবার ইমিগ্রেশন পার করে আসে তার তো পালিয়ে যাবার কোন প্রসঙ্গ নেই এবং দ্বিতীয় কথা হচ্ছে এই যে দেশের বাইরে যাওয়া তো আমার জীবনে প্রথম না, আমাকে বহুবার দেশের বাইরে যেতে হয়েছে, শুটিং করতে হয়েছে, সামনেও দেশের বাইরে শুটিং করতে হবে।
ফলে এটা কেউ কেউ ক্ষোভ থেকে বলতে পারে কিন্তু আমার অবস্থানটা খুব সিম্পল, যে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি আমার জন্ম হতো আমার অবস্থানটা মানুষের পক্ষে থাকতো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই থাকতো। চব্বিশে আমি জীবিত ছিলাম, এর আগে আমার স্ট্রোক হয়েছে, মারা গেলে হয়তো আমি ২৪ দেখতাম না। ২৪ এ আমি জীবিত ছিলাম এবং আমি মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। এখন ৭১-এ যদি আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিতাম একটা পক্ষ তো আমার উপর নারাজ হতো। এই নারাজ হওয়াতে আমাদের কিছু করার নাই।
জুলাই জাদুঘর অবশেষে উদ্বোধন হয়েছে। এতদিন উদ্বোধন না হওয়ায় মানুষজন বিশেষ করে জুলাই যোদ্ধারা অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিল। নানা রকম সমালোচনাও হয়েছে। আপনিই শুরু করেছিলেন এই কাজটা…
জুলাই জাদুঘরটা আমার অনেক আবেগের জায়গা এবং আমাদের অনেক মানুষ এর পেছনে কাজ করেছেন। বহু মানুষ এই জুলাই জাদুঘরের পিছনে শ্রম দিয়েছেন। আসলে একটা জাদুঘর তো জাস্ট হাওয়া থেকে তৈরি হয়ে যায় না। আমাদের জাদুঘরটা- যখন আমাদের সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে তখন আমরা উপলব্ধি করলাম যে আমাদের ৮০ শতাংশের মত কাজ হয়েছে। আমাদের আর ২০ শতাংশ এর মত কাজ বাকি আছে। তো সে অবস্থায় আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে সকল রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেখানোর। পাশাপাশি বিদেশী বিভিন্ন বড় বড় সংবাদ মাধ্যম বা দূতাবাস তাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেখানো এবং তাদেরকে দেখিয়েছি।
একটা জিনিস যেটা আমাকে খুবই আপ্লুত করেছে, জাদুঘরটা যখন একটা মানুষ দেখতে ঢোকে শুরুতে তিনি একটা মানুষ থাকেন এবং যখন বের হয়ে যান তিনি তখন অন্য মানুষ হয়ে বের হন। এবং এ কথাটা শুধু যে বাংলাদেশের যারা যারা দেখেছেন তারা বলেছেন এমন না, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভিজিটর এটা ভিজিট করেছেন। এর আগে আপনারা জানেন এবং দুনিয়ার তিনটা বড় পত্রিকা আমি নাম বলতে পারি “ব্রিটিশ টাইমস”, আরেকটা হচ্ছে “লা মঁদে” ফ্রান্সের, আরেকটা হচ্ছে জার্মান টপ ডেইলি “টাজ”। তারা যে রিভিউ লিখেছে মিউজিয়াম নিয়ে, এটা এত অল্প সময়ে হয়েছে, এত ইমপ্যাক্টফুল, এটা তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না। এটা আমি মনে করি অনেক মানুষের শ্রম। এটা আমার একার, আমার মন্ত্রীর দয়িত্বের বাইরেও কিন্তু আমি এই মিউজিয়ামের একটা বাড়তি দায়িত্ব পালন করেছি। সেটা হচ্ছে আর্টিস্টিক ডিরেক্টর, যেটা খুব অল্প মানুষ হয়তো জানে এবং এটা অবৈতনিক। এটার জন্য সরকার আমাকে কোন সহায়তা দেয়নি।
আমরা যখন জাদুঘর শুরু করার কথা ভাবি তখন এটা নিয়ে আমি দৃকের শহিদুল আলম ভাইয়ের সঙ্গে একটু কথা বলি। আমরা জানার চেষ্টা করি যে বাইরে থেকে কনসাল্ট্যান্ট এনে কীভাবে আমরা এটা শুরু করতে পারি। তো এছাড়া আমার যে ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্স আছে, বন্ধুবান্ধব পরিচিত তাদের মাধ্যমে আমরা আরেকটা কমিউনিকেশন চ্যানেল তৈরি করি।
তো আলম ভাই এবং আমার সোর্স দুই সোর্স থেকে একই তথ্য আমরা পাই। তারা বলে যে প্রথমত, রিসার্চ ফেইজে ওদের ছয় মাস থেকে দুই বছর সময় দিতে হবে। এরপরে এটা তৈরি করার জন্য ওদের আরো দুই বছর লাগবে। কারণ ছোট ছোট টেক্সট প্রডিউস করা, রিসার্চ করা। টেক্সট মানে কিন্তু একটা সমুদ্রের মধ্য থেকে আপনি একটা চামচ তুলে নিয়ে আসছেন। কোন চামচটা আপনি তুলবেন? এটা খুব কঠিন গবেষণার কাজ। এবং যে ফি দেখি আমরা, কনসাল্টেন্সি ফি, আমার সোর্স থেকে যেটা আমি জানতে পারি- সেটা প্রায় হাফ মিলিয়ন ডলার। সোর্সটাও প্রায় কাছাকাছি অ্যামাউন্ট। এবার আমরা তো জানি আমাদের বাজেট কত! তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই- ফাইন লেটস ডু ইট আওয়ারসেলফ।
তখন আমি এটার ক্রিয়েটিভ ডিরেকশন আর্টিস্টিক ডিরেকশনে কাজ দেই তানজিম ওয়াহাবকে। জাতীয় জাদুঘরে ডিজি এখানে অতিরিক্ত কাজ হিসেবে চিফ কিউরেটরের কাজ করেন। এটার জন্য তিনি কোন সম্মানী পাননি। মেরিনা আপা ওয়ার্ল্ড রিনাউন্ড আর্কিটেক্ট, উনি জাদুঘরের পর্ষদের সভাপতি। এখানেও উনি অবৈতনিক কনসাল্টেন্সি করেছেন। এর বাইরে শত শত তরুণ কাজ করেছে এখানে, শত শত। এই সমস্ত তরুণদের আবেগের ফল হচ্ছে এই জাদুঘর।
এই জাদুঘর নিয়ে যে মিথ্যাচার প্রপাগান্ডা হয়েছে এর উত্তর দিতে চাই না। কারণ এটা আমাদের ক্লান্ত করে। এটা নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট না করে আমি আজকে আনন্দের কথা বলতে চাই যে জাদুঘরটা ওপেন হয়েছে। আই অ্যাম ভেরি ইমোশনাল। যদিও আমি এখন জাদুঘরের সঙ্গে ইনভলভ না, বাট দ্যাট ইজ মাই বেবি, আই ক্যান জাস্ট সে, এটা আমার আবেগ। এবং আমি একই সঙ্গে ধন্যবাদ জানাতে চাই তানজিব ওয়াহাবসহ প্রত্যেককে যারা আমার সঙ্গে কাজ করেছেন, মেরিনা আপা এবং এন্টায়ার ইয়াং টিম এবং ভলান্টিয়ার্স। জুলাইয়ের ছেলেপেলে যারা আছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের- প্রত্যেকে কাজ করেছে, তাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। পাশাপাশি আমি ভিজিটরদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলতে চাই যে, জুলাই কিন্তু একটা মহাসমুদ্র, শুধু দেড় বছরের প্রচেষ্টায় এই জাদুঘর সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে না। এই জাদুঘর হচ্ছে ক্রমাগত ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস। এবং এই জাদুঘরের আমরা যে চিন্তা করেছি সেখানে চিন্তাটা এরকম ছিল যে, প্রতিনিয়ত, প্রতি মাসে নতুন নতুন কিউরেশন হবে। নতুন নতুন কন্টেন্ট ঢুকবে। নতুন আইডিয়া নিয়ে আমরা কাজ করব।
কারণ আমাদের শহীদের সংখ্যা প্রচুর। সব শহীদের উপর ডকুমেন্টারি বানালে আপনি ভাবেন কতগুলো ডকুমেন্টারি লাগে! গেজেটভুক্ত আছে এখন পর্যন্ত ৮৪১। গুম হয়েছে কত মানুষ! ক্রসফায়ারে গেছে কত মানুষ! রাজনৈতিক ১৬ বছরের অত্যাচারের শিকার হয়েছে কত মানুষ! সবার উপরেই ডকুমেন্টারি করা এই জাদুঘরের কাজ। এগুলো করতে সময় লাগবে। কিন্তু হবে।
আপনারা প্রথমবার যখন যাবেন যা যা আছে সেগুলো যে আবেগ আপনাকে আপ্লুত করবে, সে আবেগটাকে গ্রহণ করবেন যে, যেই যেই জিনিস আপনি ভেবেছেন- এগুলো থাকলে ভালো হতো, সেগুলো দেখবেন যে এক মাস পরে গিয়ে আবার কিছু উঠেছে (যোগ হয়েছে)। এটা ক্রমাগত হতে থাকবে।
আরেকটা কাজ করবে এই মিউজিয়ামটা। আমি ইনভলভ্ নাই কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তারা এটা রক্ষা করবে। এভাবে এই জাদুঘর বানানোর পিছনে একটা বড় দর্শন ছিল আপনারা জানেন যে এই জাদুঘরের কথা প্রথম বলেছিলেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সেপ্টেম্বরে একটা ভিডিও বক্তৃতায়। এরপরে আমাদের সময়ের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনূস। উনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন যে এটাকে মিউজিয়ামে রূপ দিতে হবে। তখন আমাদের চিন্তাটা একদিকে ছিল এরকম যে, এই মিউজিয়ামের মাধ্যমে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের ইতিহাস বলা।
পাশাপাশি এই মিউজিয়ামটা আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের ডিসকোর্স তৈরি করার একটা জায়গায় পরিণত হোক আমরা চাই। এবং এটার প্যাটার্নটা এরকম- রিসার্চের একটা সেকশন আছে, যে যে সেকশন নিয়ে এমনকি ভাসানীকে নিয়ে রিসার্চ করবে, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে করবে, ৭ মার্চ নিয়েও করবে, শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চে বক্তৃতা কেন এরকম দিয়েছেন সেটা নিয়ে সে রিসার্চ করবে, বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে রিসার্চ হবে, ৭২ থেকে ৭৫ এর বাকশাল নিয়ে রিসার্চ হবে, জিয়াউর রহমান প্রথম কেন বাংলাদেশের স্টেটসম্যান হয়ে উঠলেন সেটা নিয়ে রিসার্চ হবে।
এই কাজ শুধু রিসার্চ মানে কাগজ কলমে না, রিসার্চ এবং রিসার্চের পরপরই দুইটা কাজ করা। একটা হচ্ছে টেক্সট বুকের সঙ্গে সমন্বয় করা। আরেকটা কাজ হচ্ছে যে এটার ক্রিয়েটিভ কন্টেন্ট অর্থাৎ কালচারাল প্রোডাক্ট রেডি করা। ডকুমেন্টারি বা মিউজিয়াম এক্সিবিশন এই জিনিসগুলো তৈরি করার কাজ হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ওখানে একটা মুক্তমঞ্চ আছে যেখানে গানবাজনা হবে। সংসদে কোন একটা বিষয়ে ডিবেট হচ্ছে, সেই একই বিষয়ে এখানে পাবলিক ডিবেট হবে মিউজিয়ামে। সো এইটা যেন আমাদের দেশের মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ইতিহাসের ঐতিহাসিক ডিসকোর্স তৈরি করার একটা জায়গায় পরিণত হয় এটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল তৈরি করার সময়। আমি বিশ্বাস করতে চাই বর্তমান সরকারও এই লক্ষ্যটা মাথায় রেখে আগাবে।
তার মানে গত ১৭ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক কার্যক্রমগুলো, জুলুমের চিত্রগুলো সবই এখানে থাকবে?
হ্যাঁ, ১৭ বছরের সবকিছুই পাবেন, সবকিছু মানে সব চ্যাপ্টার পাবেন। তবে সবকিছুই একবারে আসবে না। অনেক ধীরে ধীরে, অনেক কিছু যুক্ত হবে। যেমন এখানে ৭২ থেকে ৭৫ একটা সেগমেন্ট তৈরি হবে, যার আবছা ছায়া পাবেন, এখনো তৈরি হয়ে ওঠেনি। নির্বাচন নিয়ে কী কী হয়েছে বাংলাদেশে এইটা নিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেকশন পাবেন। এগুলো সময় লাগবে।
তো সেই কাজগুলোকে গতিশীল রাখার যথাযথ ব্যবস্থা কি আছে? আপনি কি সেটা করে রেখে যেতে পেরেছেন?
আমার মনে হয় না প্রশাসনিক গতিটা আমরা তৈরি করতে পেরেছি। তবে আমি এই আলাপটা কয়েকটা সভায় বলেছি, এখানেও বলতে চাই। আমি মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নজর দিবেন, এই অর্থে যে এটাকে সরকারের অধীনে না রেখে একটা ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে রেখে এবং যদি ইফেক্টিভ মানুষজনকে দিয়ে দেওয়া যায় এইটা অনেক গতিশীল একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এবং এইটা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশপন্থী একটা কালচারাল ইনস্টিটিউশন হয়ে উঠবে। বর্তমান সরকার যেটা বলছে সবার আগে বাংলাদেশ, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেটা বলেছিলেন যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। এর মানে কী? মানে বাঙালি, চাকমা, মারমা, গারো, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান আমরা সবাই মিলে একটা দেশ। এই যে সবাই মিলে যে আমাদের ডিসকোর্সটা কালচারাল এন্ড পলিটিক্যাল সেটা হয়ে ওঠা এই জাদুঘরের পক্ষে সম্ভব। এবং এই জাদুঘর এত বেশি এনেেগজিং, এত বেশি ইমোশনালি ইমারসিভ এক্সপেরিয়েন্স দেয় মানুষকে, ফলে এই জাদুঘরকে কেন্দ্র করেই ওই কালচারাল এবং পলিটিক্যাল ডিসকোর্স তৈরি করার সুযোগটা সরকারের গ্রহণ করা উচিত রাষ্ট্রের প্রয়োজনে।
জাদুঘর নিয়ে অনেক কথা হল এবার অন্য প্রসঙ্গ। আপনি সিনেমার মানুষ । নতুন ফিল্ম কবে আসছে?
আমি ফিল্ম মেকিং এ ফেরার জন্য অস্থির হয়ে আছি। স্ক্রিপ্ট লিখছি, দুইটা গল্প নিয়ে কাজ করছি। জানিনা কোনটার আগে স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হবে। এই ১৮ মাসের পরে তো আরো দুই তিন মাস গেল একই চক্করে। এই চক্কর থেকে বের হয়ে আমি দ্রুত গল্পে ঢুকতে চাই। তবে জানি না কোনটা আগে করব। আমার ধারণা একটা প্রেমের গল্প নিয়ে আসাটা ভালো। তাহলে মাথাটাও আমার একটু রিফ্রেশড হবে। দেখি কোনটা আগে আসে।
অনেকেই বলছেন, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কি আর ‘ব্যাচেলর’-এর মত সাহসী সিনেমা বানাতে পারবে?
ব্যাচেলরের চেয়েও সাহসী সিনেমা লিখছি এখন। একই ইস্যু নিয়ে, তরুণ তরুণীদের মন- সেটা নিয়ে লিখছি। দেখা যাক, কবে এটা বানানো যায়। ব্যাচেলর যেরকম একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিব্রত করেছিল আবার একটা বিশাল জনগোষ্ঠী এটাকে ভালোবেসেছিল। আমার তো মনে পড়ে ব্যাচেলরের পর পরবর্তী চার বছর পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় গেলে আমি গালি খেতাম। গালি খাওয়া তো আমার একটা নিয়তি। তো তারপর একসময় এসে দেখি না এখন আর গাল দিচ্ছে না। এখন ব্যাচেলরকে বলছে কাল্ট ফিল্ম। তো এখন যেটা আমি লিখছি এটাও আমার ধারণা- এখনকার সময় তো আরো আরো আগুন ঝরা ব্যাপার। প্রেমেরই গল্প। ফলে এটাও হয়তো জাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করবে। আমার কিছু করার নাই।






