ভয়

ভয়

কিন্তু কী আশ্চর্য! আমি উল্টো প্যান্ট পরে নিলাম থ্রি-কোয়ার্টারের ওপর। দাদু এমনই বলেছিল, কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজের মধ্যে। দাদু বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর ছেড়ে, আমিও রুম ছাড়লাম। গেটে তালা মারা। চাবি এনে দরজা খুললাম। যেভাবে খুলেছিল দাদু। খুলেই দেখেছিল শহীদুল তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বলছে, চল চল… দেরি হয়ে গেল…

দাদু বলেছিল, কেন? কয়টা বাজে এখন?

সময় বুঝতেই দাদু আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। আর তখনই দেখেছিল চাঁদটা। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ দাদুর দিকে তাকিয়েই যেন হাসছে। কী আশ্চর্য! ভোরবেলা এই মধ্য আকাশে চাঁদ কেন? আকাশও তো কালো। দাদু ভালো করে খেয়াল করে দেখল শুধু আকাশ না, তার চারপাশই কালো। দাদুর কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল—ভো…ভোর হয় নাই? ফজর হয় নাই?

শহীদুল হাসল তাতে একটু। তারপর অদ্ভুতভাবে বলল, যত আগে যাবি, তত বেশি পরি দেখতে পাবি, জামাল। চল…

এবার দাদুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান শহীদুলের। ওদিকে একই রকম অদ্ভুত হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছে সাদ্দাম হোসেন—চল…চল দেরি হয়ে যাচ্ছে!

আমি আকাশের দিকে তাকাই। না, চাঁদ নেই। আশপাশও ফকফকা। রাস্তাটা একটু দূরে। চায়ের দোকান খুলছে একজন। কণ্ঠ আমারও কেঁপে উঠল তবু —ফজর হইছে?

‘কবেই হইছে…চল…’

সাদ্দাম হোসেন আমার হাত ধরে। ওদিকে পাগলা নদীতে টেনে নিয়ে যায় দাদুকে। ঝপাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে দাদু। যে নদী একলাফে পার হওয়া যায় সে নদীতে ডুবতে বসে দাদু। বিস্তর পানি খায়। যে নদীতে শেওলা আটকে থাকে, কচুরি আটকে আটকে যায়, সে নদীতে ওঠে হঠাৎ স্রোত। ভাসতে থাকে দাদু। পানির তীব্র টানে ভেসে যেতে থাকে দাদু। শহীদুল তার হাত ধরে থাকে। দাদু খেয়াল করে শহীদুলের চোখের পলক পড়ছে না। দাদু খেয়াল করে শহীদুলের পায়ের পাতা দুটি সোজা নয়।

আমরা দ্রুত হাঁটছি। কোন দিকে হাঁটছি আমি জানি না। আমি খেয়াল করতে থাকি সাদ্দাম হোসেনের পায়ের দিকে। তার পায়ের পাতা সামনের দিকেই ছুটে যাচ্ছে। অসম্ভব গতিতে যাচ্ছে। আমি পেরে উঠছি না। হাঁপাচ্ছি। হঠাৎই আমি থমকে বলে, সাদ্দাম…

সাদ্দাম ঘুরে তাকায়।

আমি সাদ্দামের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। অনেকক্ষণ। সাদ্দাম বলে, কী হইল? আরেকটু দেরি হলে আর পাব না কিন্তু…

আমি তাকিয়েই থাকি। চোখের পলক কি পড়ছে সাদ্দাম হোসেনের?

পাগলা নদীর বেভুল টানে অনেক অনেক দূর ছুটে যায় দাদু। ছুটতে ছুটতে তার দেখা মেলে মরা সাপের ভাসতে থাকা শরীর, শাঁকচুন্নির এলোমেলো চুল, এমনকি পিশাচের খসে পড়া পালকও। আর যখন তারা একটা ঘাটে আটকায়, দাদুকে হ্যাঁচকা টানে টেনে তোলে শহীদুল। দাঁড় করিয়েই বলে, দেখ, ওই যে দেখ…

পার্কের ভেতর ঢুকিয়ে দিগ্‌বিদিক ছোটে সাদ্দাম হোসেন। তার পেছনে আমি। জংলা কিছু গাছের মধ্যখানে নিয়ে সাদ্দাম দাঁড়ায়। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছ। গাছের নীলচে পাতায় কেবল উঠতে ধরা সূর্যের লালচে আভা। সাদ্দাম বলে, দেখ, ওই যে দেখ…

দাদু তাকিয়ে দেখে দিগন্তজুড়ে সূর্যমুখী ফুল। মাথা নুইয়ে তাকিয়ে আছে পুবে। অনেক দূর থেকে আজান ভেসে আসতে থাকে। মৃদু বাতাসে নড়তে থাকে ফুলগুলো।

আমি বলি, ‘আর কিছু দেখোনি দাদু?’

দাদু হাসে।

আমি বলি, ‘পিশাচ দেখছ দাদু?’

দাদু হাসে।

আমি বলি, ‘তাহলে কি পরি দেখছিলে দাদু?’

দাদু হাসে।

আমি বলি, ‘দাদু, শহীদুল কি ভোলা ছিল? উল্টো পায়ের পাতা, অপলক চোখ…শহীদুল কী ছিল দাদু?’

দাদু বলে, ‘ভয়। শহীদুল ভয় ছিল।’

সাদ্দাম আঙুল তাক করে। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দেখতে পাচ্ছিস?’

বড় এক গাছের কোটরের সামনে বসে আছে সেটা। জ্যান্ত মানুষের কাটা মুখ। অল্প অল্প নড়ছে।

‘কী ওইটা?’

‘পিশাচ। সকালের আলো ফুটতেই মিলিয়ে যাবে বাতাসে।’

পিশাচটা এবার ডানা ঝাপটাল। আলো ফুটে উঠছে। পিশাচটা এবার একটু একটু পিছিয়ে যেতে শুরু করল। আমরা তাকিয়ে আছি। চোখের পলক পড়ছে না আমাদের।

কোটরে ঢুকতেই বুঝলাম, ‘ওটা পিশাচ না। ওটা প্যাঁচা। খুব বড় আর সুন্দর একটা প্যাঁচা। আর বাকিটা, দাদু যেমন বলেছিল—ভয়!’