
আইনজীবী ও মক্কেলের সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। একজন মানুষ যখন সন্তানের হেফাজত নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন, চাকরি হারানোর বিচার চান, ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন কিংবা বাড়ি কেনাবেচার ক্লোজিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাজে সহায়তা নেন, তখন তিনি শুধু নিজের হয়ে লড়াই করার দায়িত্বই একজন আইনজীবীর হাতে তুলে দেন না, সেই সঙ্গে তুলে দেন নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থও। আদালতের ভাষা, আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় দুর্বোধ্য। সেই সুযোগে কোনো আইনজীবী যদি সত্য গোপন করেন, ভুয়া আদালতের আদেশ তৈরি করেন কিংবা বহু আগেই খারিজ হয়ে যাওয়া মামলার নামেও টাকা নিতে থাকেন, তাহলে সেই প্রতারণার ক্ষতি শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের জীবন, বিপর্যস্ত হয় পরিবার এবং ধীরে ধীরে বিচারব্যবস্থার ওপর থেকেও মানুষের আস্থা সরে যেতে থাকে।
ইয়র্ক অঞ্চলের সাবেক আইনজীবী অ্যাডাম হোয়াইটের ঘটনা সেই বিশ্বাসভঙ্গেরই এক ভয়াবহ উদাহরণ। তিনি বছরের পর বছর মক্কেলদের এমন আদালতের আদেশ ও বিচারিক নথি দেখিয়েছেন, যেগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব ছিল না। একটি মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার পরও মক্কেলকে তা না জানিয়ে টাকা নিয়েছেন। আরেক মক্কেলকে বিচারকের নামে তৈরি জাল নথি দেখিয়ে বুঝিয়েছেন, তাঁর পারিবারিক মামলা এগোচ্ছে। বাইরে থেকে সবকিছুই যেন স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া, কিন্তু ভেতরে চলছিল দীর্ঘ এক প্রতারণা।
শেষ পর্যন্ত সেই প্রতারণা ধরা পড়ে। ৫২ বছর বয়সী হোয়াইটকে প্রতারণা ও জাল নথি ব্যবহারের অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন Ontario Court Justice Sandra Bacchus। বিচারকের ভাষায়, তাঁর কর্মকাণ্ড বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তিতেই আঘাত করেছে। কারণ আদালত শুধু আইন দিয়ে চলে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের পারস্পরিক আস্থা। হোয়াইট সেই আস্থাকেই নিজের মক্কেলদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। ক্রাউন চেয়েছিল ২২ মাসের কারাদণ্ড; বিচারক দিয়েছেন তার চেয়েও বেশি।
হোয়াইট কোনো অখ্যাত কিংবা অচেনা আইনজীবী ছিলেন না। তিনি York Region Law Association-এর সাবেক সভাপতি; সংগঠনটির তালিকা অনুযায়ী ২০১৮ সালে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তাঁর পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান একজন সাধারণ মক্কেলের কাছে বাড়তি আস্থার জায়গা তৈরি করেছিল।
একজন মক্কেল হোয়াইটকে নিয়োগ করেছিলেন wrongful dismissal মামলা পরিচালনার জন্য। মামলাটি ২০১৯ সালের জুনে খারিজ হয়ে যায়, কিন্তু মক্কেলকে তা জানানো হয়নি। বরং পরবর্তী কয়েক বছর তাঁর কাছে এমন সব নথি পৌঁছাতে থাকে, যাতে মনে হয় মামলা দিব্যি চলছে। প্রতিপক্ষের আইনজীবীর নামে সমঝোতার একটি ভুয়া প্রস্তাবও তাঁকে দেখানো হয়েছিল। অথচ মামলা খারিজ হওয়ার পর তাঁর ওপর প্রতিপক্ষকে মামলা খরচ বাবদ ৮ হাজার ডলার দেওয়ার দায়ও পড়ে। আরও বিস্ময়কর হলো, মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি হোয়াইটকে ৭ হাজার ডলার দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে আইনজীবীকে দিয়েছিলেন ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার।
আরেকটি ঘটনা আরও বেদনাদায়ক। সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ ও হেফাজতের অধিকার নিয়ে আইনি লড়াই করছিলেন এক বাবা। হোয়াইট তাঁকেও একের পর এক ভুয়া বিচারিক নির্দেশনা দেখিয়েছেন, এমনকি একজন প্রকৃত বিচারকের স্বাক্ষরও নকল করা হয়েছিল। একটি নথিতে এমনভাবে দেখানো হয় যেন বিচারক বাবার পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন। বাস্তবে সন্তানদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বাড়ানোর মামলাটি এগিয়ে নিতে প্রায় কোনো কাজই করা হচ্ছিল না।
ওই ব্যক্তির আইনি খরচ বহন করছিলেন তাঁর মা। শুরুতে তিনি হোয়াইটকে রিটেইনার বাবদ ৫ হাজার ডলার দেন, পরে বিভিন্ন সময়ে আরও ১১ হাজার ডলারের বেশি পরিশোধ করেন। এর মধ্যে ২০২২ সালের জুনে “ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপের” কথা বলে নেওয়া ২ হাজার ৮২৫ ডলারের বিপরীতে কোনো আদালতের কার্যক্রমই ছিল না। সাজা ঘোষণার সময় বিচারক সেই অর্থ মাকে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এর চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছিল অন্য জায়গায়। ওই বাবা পরে বলেছেন, সন্তানদের বড় হয়ে উঠতে তাঁকে দেখতে হয়েছে ভিডিও কলে। মানুষ একবারই জীবন পায়, সন্তানদের বেড়ে ওঠা দেখার সুযোগও একবারই আসে; হারিয়ে যাওয়া সেই সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না। হোয়াইটের অপরাধ তাই শুধু টাকার হিসাবের মধ্যে আটকে থাকেনি। একজন মক্কেল হারিয়েছেন অর্থ, আরেকজন হারিয়েছেন সন্তানের শৈশবের একটি অমূল্য সময়; যে ক্ষতি কোনো আদালতের রায় ফিরিয়ে দিতে পারে না।
জালিয়াতির ঘটনায় Law Society Tribunal ২০২৩ সালে হোয়াইটের আইনজীবীর লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং পরের বছর তা বাতিল হয়। আদালতে হোয়াইট নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং দীর্ঘদিনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কথা বলেন। তবে বিচারক তাঁর অনুশোচনা গ্রহণ করেননি।
বাঙালি সমাজে উকিল নিয়ে ব্যঙ্গ, রসিকতা ও অবিশ্বাস বহু পুরোনো। “সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য বানানো” ধরনের কথাও ছোটবেলা থেকে শুনে আসা। বিদেশ বিভূঁইয়ে এর সঙ্গে আবার যোগ হয় ভাষা ও পরিচয়ের টান। নিজের ভাষায় কথা বলা যায়, একই দেশের মানুষ, কে কার পরিচিত, কে কতদিন ধরে কমিউনিটিতে আছেন, কার সঙ্গে কার ওঠাবসা, এসব অনেক সময় যোগ্যতা যাচাইয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। অথচ ব্যক্তিগত পরিচয়, সামাজিক ওঠাবসা কিংবা কমিউনিটির কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, এর কোনোটিই একজন আইনজীবীর দক্ষতার সনদ নয়।
বাংলাদেশি কমিউনিটিতে কিছু আইনজীবীর পেশাগত আচরণ নিয়ে অসন্তোষ ও অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। দুর্বল ড্রাফটিং, আদালতে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া হাজির হওয়া, ফি নিয়ে অস্পষ্টতা, মক্কেলকে সময়মতো তথ্য না দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা না রাখার অভিযোগও এর মধ্যে রয়েছে।
পেশাগত আচরণ নিয়ে অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। কমিউনিটিতে এমন অভিজ্ঞতার কথাও শোনা যায়, যেখানে কিছু অসাধু আইনজীবী মামলা নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে অকারণে ঝুলিয়ে রাখেন, তারিখের পর তারিখ নেন এবং তাতে মক্কেলের সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হতে থাকে। কোনো কোনো মামলায় বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের আইনজীবী বাংলাদেশি হলে দুই আইনজীবীর যোগসাজশে মামলা দীর্ঘায়িত করার অভিযোগও রয়েছে। আরও ভয়াবহ অভিযোগ হলো, কোনো কোনো আইনজীবী প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিজের মক্কেলের স্বার্থ রক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থাকেন কিংবা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকেন। ফলে যে আইনজীবীর হাতে একজন মানুষ নিজের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেন, সেই আইনজীবীই যদি গোপনে বিপরীত পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করেন, তাহলে তা শুধু পেশাগত অসততাই নয়, নিজের মক্কেলের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতাও।
গোপনীয়তার জায়গায় বিষয়টি আরও গুরুতর। ডিভোর্স, ইমিগ্রেশন ফাইল, পারিবারিক বিবাদ, ব্যবসায়িক সমস্যা কিংবা বাড়ি কেনাবেচার মতো কাজে একজন মক্কেল এমন অনেক তথ্য আইনজীবীর হাতে তুলে দেন, যা অনেক সময় নিজের ঘনিষ্ঠজনের কাছেও প্রকাশ করেন না। সেই তথ্য অন্যের কাছে বলে দেওয়া কিংবা কমিউনিটির খোশগল্পে ছড়িয়ে দেওয়া নিছক অপেশাদার আচরণ নয়। Law Society of Ontario-এর নিয়ম অনুযায়ী, পেশাগত সম্পর্কের সূত্রে মক্কেল সম্পর্কে পাওয়া তথ্য কঠোরভাবে গোপন রাখা একজন আইনজীবীর দায়িত্ব। মক্কেলের অনুমতি কিংবা আইনে স্বীকৃত ব্যতিক্রম ছাড়া সেই তথ্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।
একটি মামলা বা অন্য কোনো আইনি কাজ হাতে নেওয়ার পর কোন কাজের জন্য কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, ফি কীভাবে হিসাব হবে, কী খরচ আলাদা এবং ফাইলটি কে দেখবেন, এসব বিষয় সাধারণত লিখিত retainer agreement-এ পরিষ্কার থাকার কথা। কিন্তু শুধু মৌখিক কথার ওপর নির্ভর করলে পরে কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, কোন কাজের জন্য দেওয়া হয়েছিল কিংবা আদৌ সেই কাজ হয়েছিল কি না, তা নিয়েই জটিলতা তৈরি হতে পারে। আইনজীবী-মক্কেলের সম্পর্ক বিশ্বাসের হলেও আর্থিক লেনদেন ও কাজের হিসাব লিখিত থাকা জরুরি। মামলা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং কী কাজ হয়েছে, সেটি জানাও মক্কেলের স্বাভাবিক অধিকার।
প্রতারণা সাধারণত একদিনে ধরা পড়ে না। শুরুতে দেখা দেয় ছোট ছোট অসঙ্গতি। বলা হয় সব ঠিক আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় নথি মেলে না; মামলার নম্বর কিংবা শুনানির তারিখ নিয়ে অস্পষ্টতা থাকে; নতুন নতুন খরচের কথা আসে, অথচ কাজ কতটা এগিয়েছে তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এমন অসঙ্গতি একটির পর একটি জমতে থাকলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। সেই প্রশ্ন অনেক দেরিতে উঠলে ক্ষতির পরিমাণও অনেক বড় হয়ে যেতে পারে।
সমস্যা হলো, আমাদের কমিউনিটিতে আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষেত্রেও এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে। অনেকে মনে করেন, উকিলের সঙ্গে বিরোধে জড়ালে ঝামেলা আরও বাড়বে। কেউ আবার পরিচিত মানুষ, একই কমিউনিটির সদস্য কিংবা দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা ভেবে বিষয়টি চেপে যান। এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত অসৎ পেশাজীবীকেই সুবিধা দেয়।
অন্টারিওতে আইনজীবী ও paralegal-দের পেশাগত কার্যক্রম তদারক করে Law Society of Ontario। কোনো আইনজীবীর সততা, পেশাগত আচরণ, গোপনীয়তা রক্ষা কিংবা মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকলে সেখানে তা জানানোর সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী Law Society বিষয়টি পর্যালোচনা করতে পারে, তদন্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। অর্থাৎ একজন আইনজীবীর হাতে মামলা বা আইনি কাজ তুলে দেওয়ার পর মক্কেলের আর কিছুই করার নেই, বিষয়টি এমন নয়। আইনজীবীর কাজেরও জবাবদিহি করার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা রয়েছে।
টাকা-পয়সা নিয়ে অসততার শিকার হলেও প্রতিকারের একটি পথ রয়েছে। Law Society of Ontario-এর Compensation Fund নির্দিষ্ট শর্তে কোনো আইনজীবী বা paralegal-এর অসততার কারণে মক্কেলের হারানো অর্থের পুরোটা কিংবা একটি অংশ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে পারে। এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রসিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চেক কিংবা অন্য কোনো লেনদেনের নথি তখন দেখাতে পারে, কখন কত টাকা দেওয়া হয়েছিল এবং কী উদ্দেশ্যে সেই অর্থ নেওয়া হয়েছিল।
আইনজীবীর দায়িত্ব আইনের ভেতরে থেকে মক্কেলের স্বার্থ রক্ষা করা। সেই দায়িত্বই যদি উল্টো মক্কেলের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, কমিউনিটির সম্পর্ক কিংবা পেশাগত পদবি তাঁকে দায়মুক্তি দিতে পারে না। হোয়াইটের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, ফৌজদারি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত তিন বছরের জন্য কারাগারে যেতে হয়েছে। ঘটনাটি তাই মনে করিয়ে দেয়, কানাডায় আইনজীবীর হাতে আইন আছে, কিন্তু আইনজীবী নিজেও আইনের বাইরে নন।
তথ্যসূত্র:
Toronto Star, August 12, 2026
R. v. White, 2026 ONCJ 27
Law Society of Ontario



