ময়মনসিংহের মেয়ে রত্না থেকে অভিনেত্রী নূতন | চ্যানেল আই অনলাইন

ময়মনসিংহের মেয়ে রত্না থেকে অভিনেত্রী নূতন | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ, মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গড়ে ওঠা ময়মনসিংহ শহরও তেমনই এক জনপদ। এই শহরের অলিগলিতে হেসে-খেলে বেড়ে উঠেছিলেন রত্না নামের এক কিশোরী। সময়ের পরিক্রমায় সেই রত্নাই হয়ে উঠেছিলেন চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ অভিনেত্রী নূতন।

ষাট ও সত্তরের দশক ছিল এ দেশের সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্রজগতের স্বর্ণালি সময়। ময়মনসিংহ শহরে দীর্ঘ সময় ধরে ছিল তিনটি সিনেমা হল—অলকা, ছায়াবাণী ও পূরবী। তখন মানুষের অন্যতম বিনোদন ছিল সিনেমা দেখা আর রেডিওতে সিনেমার গান শোনা। সিনেমার বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হতো রেডিওতে। সেই সময়ের প্রচারণার ভাষাও ছিল আলাদা। যেমন, “আসিতে ‘দ্য রেইন’ সম্পূর্ণ রঙ্গিন লাইলি- মজনু, শিরি-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট; এবং এর পাশে আরও দুটি নাম রানী ও বাবু (অলিভিয়া- ওয়াসিম) একযোগে চলছে মধুমিতা, বলাকা, শ্যামলীতে!

সিনেমার নাম, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পরিচয়, এমনকি কখনো কখনো সংলাপ তুলে ধরে দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করা হতো।

১৯৭০ সালে মুস্তাফা মেহমুদ পরিচালিত ‘নতুন প্রভাত’ মুক্তি পায়। ছবিটি হয়তো তখন দেখা হয়নি, কিন্তু এর গান ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের মুখে মুখে ‘মোরা এতিম সর্বহারা, মোরা এতিম সর্বহারা / দয়ার দানে শুধু বেঁচে আছি জীবনের’। এই সিনেমার মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ে আসেন রত্না। আর ‘নতুন প্রভাত’-এর সূত্রেই দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নূতন’ নামে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে যাওয়া নূতন নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি তৈরি করেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। তাঁর উচ্চাঙ্গের গড়ন, অভিনয়ের সাবলীলতা এবং নৃত্যদক্ষতা তাঁকে দর্শকের কাছে করে তোলে আলাদা এক পরিচিত মুখ।

নূতনের অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে ‘ঘর সংসার’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। সেখানে তিনি নর্তকী জাবিন চরিত্রে অভিনয় করেন। সামাজিক মর্যাদা না থাকলেও ত্যাগ, মমতা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অন্যের জীবনকে অর্থবহ করে তোলা এই চরিত্র দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল। মঞ্চে নর্তকী জাবিনের কণ্ঠে ভেসে আসে- ‘আমি রাধা পাগলিনী, আমি ধীর দেওয়ানী’—যা চরিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।

‘বদলা’ ছবিতেও নূতনকে দেখা যায় যাত্রাদলের শিল্পীর চরিত্রে। নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর অভিনীত দৃশ্য ও গানের অংশগুলো দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়। ‘ওরে হলুদ পাখি বল, কোথায় তোরে’- এই গানের আবহে নূতনের অভিনয় ও নৃত্য ছিল সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ।

‘বদনাম’ ছবিতে পার্শ্বনায়িকার চরিত্রেও দর্শকের নজর কাড়েন নূতন। তবে তাঁর অভিনয়ক্ষমতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলোর একটি ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় মহনায়ক বুলবুল আহমেদের বিপরীতে তাঁর অভিনয় ছিল প্রশংসনীয়।

ছবির একটি স্মরণীয় দৃশ্যে শ্রীকান্ত আশ্রমে এলে তাঁকে ‘নতুন গোস্বাই’ বলে সম্বোধন করা হয়। নূতনের চরিত্র প্রীতিময় যত্ন, ভক্তি ও ভালোবাসায় তাকে বরণ করে নেয়। বিদায়ের মুহূর্তে পেছনে বেজে ওঠে কালজয়ী গান- ‘শাওনো রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে…’। সেই আবহে নূতনের অভিনয় চরিত্রটির আবেগকে আরও গভীর করে তোলে।

অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যেও ছিলেন দক্ষ নূতন। চলচ্চিত্রের দীর্ঘ যাত্রায় তিনি নায়ক-নায়িকার বাইরেও নানা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে গল্পকে পূর্ণতা দিয়েছেন। তাঁর মতো শিল্পীদের অবদানই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

তবু এই গুণী শিল্পীকে ঘিরে রয়েছে এক আক্ষেপও। সম্প্রতি নিজের বক্তব্যে নূতন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওরা ১১ জন’-এ অভিনয় করেও যথাযথ স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার পাননি। একজন শিল্পীকে নিজের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে এভাবে বলতে হওয়া নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।

নূতন কেবল একটি নাম নন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সাক্ষী। অভিনয়, নৃত্য ও চরিত্র নির্মাণে তাঁর অবদান আজও স্মরণযোগ্য। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের পথচলায় তিনি প্রমাণ করেছেন- সত্যিকারের শিল্পীর উপস্থিতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। চলচ্চিত্রজগতের জন্য তিনি সত্যিই এক অমূল্য রত্ন।