দেশে চলমান গ্যাস সংকটের সঙ্গে এবার কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। অন্য কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি। ফলে দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উৎপাদন আরও কমেছে। পাশাপাশি কয়েকটি কেন্দ্র নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গরমে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে লোডশেডিং। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা।
দেশে বর্তমানে ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ৬৪টি, বেসরকারি ৭০টি এবং ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কেন্দ্র রয়েছে তিনটি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকটের অন্যতম কারণ কয়লা ও জ্বালানির ঘাটতি। দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বর্তমানে বন্ধ। ভারতের ঝাড়খন্ডে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও জ্বালানি সরবরাহ ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ রয়েছে। আদানির কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে না। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোও সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়েছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। প্রায় একই সময় ধরে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও চলছে। বৃষ্টিতে চাহিদা কমলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বেড়ে যাচ্ছে।
ঢাকার বাইরে লোডশেডিং শুরু হলেও গত ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় রাজধানীতেও তা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন ঢাকার কোনো একটি এলাকায় এক ঘণ্টা লোডশেডিং করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জালোওয়াশান আখতার খান জানান, প্রতিদিন একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দুবার বিদ্যুৎ ছিল না। এর মধ্যে জেনারেটরও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে লিফটে আটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাসায় গ্যাস না থাকায় বাড়তি খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডারও কিনতে হচ্ছে।
ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী দুই প্রতিষ্ঠান ডিপিডিসি ও ডেসকোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আরও ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিকাল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত লোডশেডিং না করার কথা। তবে বাস্তবে বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী এই পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময় প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।
পিডিবি ও পিজিসিবি সূত্র জানায়, চলতি মাসে এর আগে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ১০ আগস্ট। ওই দিন লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। ৯ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ ধরে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছে। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গত দুই দিনে আবারও লোডশেডিং বেড়েছে।
কয়লা ও তেলেও সংকট
দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে বৃহস্পতিবার এসব কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে মাতারবাড়ী কেন্দ্রের একটি ইউনিট। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটেও কারিগরি ত্রুটি রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। কয়লা সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটি উৎপাদন কমিয়েছে। দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে কেন্দ্রটি।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাস সংকটে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলেও এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। রাতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট এবং দিনে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তবে পিজিসিবি সূত্র বলছে, বৃহস্পতিবার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতি ছিল।
গ্রামেও বাড়ছে লোডশেডিং
ঢাকার বাইরে দেশের অধিকাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি। সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় একই দিনে একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে আরইবি।
গত বুধবার রাত ১২টায় সারা দেশে মোট লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধু আরইবির আওতাধীন এলাকাতেই লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করেছিল। পরে পিডিবির সঙ্গে বকেয়া নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ায় উৎপাদন কমে যায়। এসব বিরোধের সমাধান হলে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে আবারও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে যায়।
১৫ আগস্ট টার্মিনালটি আবার গ্যাস সরবরাহের উপযোগী হলেও নির্ধারিত সময়ে এলএনজি কার্গো না আসায় সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সংকটের মধ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা জাহাজে এলএনজি আমদানি এবং চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এসবের মধ্যেও সংকট কাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ হবে না এবং সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
