জীবন কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়। বাইরে থেকে কোনো মানুষের জীবনের যে ভগ্নাংশটুকু দেখা যায়, তার আড়ালে জমে থাকে কত শত অব্যক্ত যন্ত্রণা, ব্যর্থতার কান্না আর দীর্ঘ নীরব লড়াই। সব কথা সবাইকে বলা যায় না, আর সবাই তা বোঝার মতো মানসিক ধারণক্ষমতাও রাখে না।
বছরের পর বছর টিকে থাকা একটি সংসার যখন বিচ্ছেদে রূপ নেয়, সমাজ খুব সহজেই বলে বসে, ‘একটু মানিয়ে নিলেই হতো’, ‘ধৈর্য কম ছিল’।
অথচ সেই মানুষটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কত বিনিদ্র রাত নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কতটুকু সহ্য করেছে, তার হিসাব বাইরের মানুষ জানে না।
রিজিক, পারিবারিক পটভূমি ও তকদিরের মতো নিয়ামকগুলোকে উপেক্ষা করে নিছক বাহ্যিক বিবেচনায় পুরো জীবনের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক মারাত্মক আত্মপ্রবঞ্চনা।
অন্যের সংকট দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগা মারাত্মক আত্মঘাতী ভাবনা ,‘আমি তো সতর্কভাবে চলি, আমার সঙ্গে এমন হবে কেন?’
আজ আমি নিরাপদ, কিন্তু কাল
অন্যের সংকট দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগা মারাত্মক আত্মঘাতী ভাবনা—‘আমি তো সতর্কভাবে চলি, আমার সঙ্গে এমন হবে কেন?’
আজ যে পাপ বা সংকট থেকে আমরা বেঁচে আছি, তা আমাদের অতিরিক্ত যোগ্যতা বা বুদ্ধিমত্তার কারণে নয়; বরং মহান আল্লাহ দয়া করে আমাদের সেই কঠিন পরীক্ষায় ফেলেননি বলেই আমরা নিরাপদ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, করুণাময় প্রতিপালক আমাদের অসংখ্য ত্রুটিবিচ্যুতি মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখেছেন। সেই আবরণ যদি সামান্য উন্মোচিত হতো, তবে অন্যের দিকে আঙুল তোলার সাহস আমাদের কারও থাকত না।
কোরআনে আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)
পরের আয়াতেই সামাজিক ক্ষতিকর ধারণার পথ বন্ধ করে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
অন্যের বিপদে মুমিনের সতর্কতা
কারও বিপদে আনন্দ প্রকাশ করা বা নিজেকে নিরাপদ ভাবা কোনো প্রকৃত বিশ্বাসীর লক্ষণ হতে পারে না। রাসুল (সা.) কঠোরভাবে সাবধান করে বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দ প্রকাশ কোরো না; নতুবা আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেন এবং তোমাকে সেই বিপদে নিপতিত করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫০৬)
বিপদগ্রস্ত মানুষকে তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। কারণ, কাউকে আল্লাহ যে পরীক্ষায় ফেলেছেন, তিনি যে আমাদের সেখানে ফেলবেন না—এমন কোনো লিখিত ছাড়পত্র আমাদের কারও কাছে নেই।
তাবেয়ি ইমাম ইব্রাহিম আন-নাখয়ি (রহ.) বলতেন, ‘আমি এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় দেখি যা আমার অপছন্দ; কিন্তু অনুরূপ পরিস্থিতিতে আমিও পড়ে যাই কি না—সেই ভয়ে আমি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকি।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৬৩৫৩)
অন্যের বিপদে কোনো কাজে আসতে না পারলে অন্তত আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত, ‘হে আল্লাহ, তার এই কঠিন পরিস্থিতি সহজ করে দিন।’
সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধি
কাউকে ব্যঙ্গ বা তাচ্ছিল্য করে কখনো সঠিক পথে ফেরানো যায় না। কোনো মানুষের দুঃখকে বিনোদন না বানিয়ে, কাঁধে একটু সহমর্মিতার হাত রাখা এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মনুষ্যত্ব।
অন্যের বিপদে কোনো কাজে আসতে না পারলে অন্তত আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত, ‘হে আল্লাহ, তার এই কঠিন পরিস্থিতি সহজ করে দিন।’ আর নিজের জন্য সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে ‘আল্লাহ, এমন পরীক্ষা থেকে আমাকে নিরাপদে রাখুন এবং অন্যের বিপদে তাচ্ছিল্য করা থেকে আমার অন্তরকে হেফাজত করুন।’
জীবন নদীর স্রোতের মতো পরিবর্তনশীল। আজ যাঁর চোখে অশ্রু, কাল হয়তো তিনিই ঘুরে দাঁড়াবেন; আর আজ যিনি নিরাপদ বোধ করছেন, কাল হয়তো তিনিই কারও সহমর্মিতার মুখাপেক্ষী হবেন। জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে পরীক্ষার পাত্র কে হবে, তা কেবল সর্বজ্ঞ আল্লাহই জানেন।
-
ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক

