বললেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

বাংলাদেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কারণ বহু আগেই শনাক্ত করে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ- এমন মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
তার মতে, ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার যে লড়াই, তার শিকড় খুঁজলে আবুল মনসুর আহমদের চিন্তাভাবনাতেই অনেক উত্তর পাওয়া যায়।
আবুল মনসুর আহমদের জন্মদিনে তাকে স্মরণ করে দেওয়া এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে এসব কথা বলেন ফারুকী। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক উপনিবেশ, নিজেদের ভাষা ও স্বর প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ফারুকী লেখেন, “আজকের কালচারাল লীগের দিকে যদি তাকান তাহলে দেখবেন আবুল মনসুর আহমদ এদের রোগ সেই কবেই ডায়াগনসিস করে গেছে।” এরপর আবুল মনসুর আহমদের দুটি বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি।
প্রথম উদ্ধৃতিতে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন, বাংলাদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের একটি অংশ নিজেদের ভাষার চেয়ে পশ্চিম বাংলার ভাষাকে বেশি ‘সত্য, শুদ্ধ, শালীন ও সাহিত্যের উপযোগী’ মনে করেন। তাদের মানসিক জগতও পশ্চিম বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
আরেক বক্তব্যে আবুল মনসুর আহমদ বলেছিলেন, ‘পূর্ব-বাংলার সাহিত্য স্বাধীনতা লাভ করে নাই’, কারণ সাহিত্যিকরা নতুন রাষ্ট্রীয় পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেননি।
এই বক্তব্যগুলোর প্রসঙ্গ টেনে ফারুকী বলেন, সাহিত্যের জায়গায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি বসিয়ে পড়লে বাংলাদেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মূল কারণটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজের দীর্ঘদিনের ভাষার লড়াইয়ের প্রসঙ্গ টেনে ফারুকী বলেন, তিনি ও তার সহযাত্রীরা ভাষা নিয়ে যে কথা ও সংগ্রামের মধ্যে ছিলেন এবং আছেন, আবুল মনসুর আহমদ তার অনেকটাই আগে থেকে ‘ফোরশ্যাডো’ করে গিয়েছিলেন।
চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গও টেনে আনেন এই নির্মাতা। তার ভাষ্য, বাংলাদেশে একসময় কলকাতার আর্ট হাউজ সিনেমা কিংবা বোম্বের সিনেমাকে অনুসরণ করার প্রবণতা ছিল। সেই জায়গা থেকে বের হয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা ও নির্মাণরীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেই নানা ধরনের গালমন্দ শুনতে হয়েছে। এর পেছনে তিনি ‘কালচারাল উপনিবেশের দাসত্ব’কে দায়ী করেন।
ফারুকীর প্রশ্ন, আবুল মনসুর আহমদ যে সমস্যাটি এত আগে শনাক্ত করে গিয়েছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও কেন সেই সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে?
এর উত্তর হিসেবে তিনি বলেন, আবুল মনসুর আহমদের মতো ব্যক্তিত্বদের যথাযথভাবে উদযাপন করা হয়নি। বরং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশ আধুনিকতার নামে একটি ‘ভুয়া রিয়ালিটি’কে প্রগতিশীলতা হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
ফারুকীর দাবি, নব্বইয়ের পরের প্রজন্ম শিল্পে নিজেদের ভাষা, স্বর ও সুর ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু এই পরিবর্তনও নানা ধরনের তকমা ও সমালোচনার মুখে পড়ে। কখনো নিজেদের গানকে ‘ফোক’, কখনো রক মিউজিককে ‘অপসংস্কৃতি’, আবার কখনো শিল্পীদের ‘ভাষাসন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, বাংলাদেশের বাঙালির নিজস্ব ও স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অবশ্যম্ভাবী ছিল। আর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনেও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক কাজ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তার কথায়,“সাংস্কৃতিক এই পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের বাঙালি যে তার নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়া মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এটা তো অবধারিতই ছিলো। ফলে আজকের জুলাইয়ের যে রাজনৈতিক চেহারা এটার পেছনের সাংস্কৃতিক কাজ কিন্তু বহু বছর ধরেই চলতেছে।”
আবুল মনসুর আহমদের ধর্ম ও জাতীয় পরিচয়বিষয়ক চিন্তার কথাও স্মরণ করেন ফারুকী। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মবিদ্বেষ এবং ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানানোর- দুই প্রবণতারই বিরোধিতা করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তার দর্শনে ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয় পরিচয় পরস্পরবিরোধী ছিল না বলেও উল্লেখ করেন ফারুকী।
পোস্টের শেষাংশে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের উদযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। ফারুকীর ভাষায়, ‘যে দেশে যে রকম মানুষকে সেলিব্রেট করা হয়, ঐ দেশে ঐরকম মানুষই তৈরি হবে।’
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘সেলেব্রেটিং বাংলাদেশী লেজেন্ডস’ নামে একটি সিরিজ চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পাশাপাশি একটি বছরব্যাপী ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় আবুল মনসুর আহমদের নাম বিশেষভাবে রাখার কথা বলেছিলেন তিনি। তবে বর্তমানে সেই উদ্যোগের কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না বলে আক্ষেপ করেন ফারুকী।
তার মতে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত ‘কালচারাল স্ট্যাটাস কো’-কে চ্যালেঞ্জ করা ও নাড়া দেওয়া। কারণ সাংস্কৃতিকভাবে প্রচলিত কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আশা করা যায় না। এমনকি রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও তা টেকসই হবে না বলেও মনে করেন তিনি।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
