
সৈয়দ তানভীর আহমেদ—বিশ্ব ফিনটেক জগতের এক পরিচিত ও সফল নাম। তবে তাঁর এই অর্জনের পেছনের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না; ছিল চরম অনিশ্চয়তা, স্বজনদের বঞ্চনা আর কঠিন বাস্তবতার এক হৃদয়বিদারক গল্প।
তানভীর তখন স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। বাবা-মায়ের অত্যন্ত আদরের সন্তান। কিন্তু হঠাৎই তাঁদের ছিমছাম ও সুন্দর পরিবারটিতে অন্ধকার নেমে আসে, যখন বাবার শরীরে কিডনি রোগ ধরা পড়ে। প্রিয় মানুষটিকে সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টায় ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায় পরিবারের জমানো সব সঞ্চয়। একপর্যায়ে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তাঁর বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মৃত্যুটি তানভীরের জীবন থেকে শুধু একজন প্রিয় মানুষকেই কেড়ে নেয়নি, বরং পরিবারের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থলটিকেই তছনছ করে দিয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পর অর্থকষ্ট যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন স্নাতক পড়ুয়া অবস্থায় তানভীর নিজের পড়াশোনার খরচ চালানো এবং মায়ের কাছে কিছু টাকা পাঠানোর চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু যে বয়সে তাঁর কেয়ার বা ভালোবাসা পাওয়ার কথা, সেই বয়সে জীবনের সব পথ তাঁর জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়।
বাবার মৃত্যুর আগে মামারা তাঁর বাবার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা ধার নিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর অর্থাভাবে পড়ে তানভীর যখন মামাদের কাছে সেই ধারের টাকা ফেরত চাইলেন, তখনই ঘটে বিপত্তি। সম্পত্তির লোভ আর পাওনা টাকা ফেরত না দেওয়ার মানসিকতা থেকে মামা-মামীরা তানভীরের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। নিজ নানা বাড়ি থেকেই বিতাড়িত হন তিনি; স্বজনদের কাছে রাতারাতি পরিচিত হন এক “ভিলেন” হিসেবে।
নানা বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে চোখে জল ও বুকে হাহাকার নিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়ান তানভীর। ঢাকায় তখন তাঁর থাকার কোনো জায়গা ছিল না। প্রথম রাতটি কাটে একটি নির্মাণাধীন ভবনের নিচে। এরপর রাতের পর রাত কেটেছে বিভিন্ন রাস্তার ফুটপাতে। আজ বিশ্ব ফিনটেক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরও, শহরের বিভিন্ন রাস্তা বা ফুটপাত দিয়ে যাওয়ার সময় তানভীর চমকে ওঠেন, থমকে দাঁড়ান—মনে পড়ে যায় সেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো কঠিন দিনগুলোর কথা।
নিকটাত্মীয়দের অপমান, অবিশ্বাস আর অপারগতার ঝড়ে তানভীরের জীবনের সব আশা-ভরসা যখন পেঁজা তুলার মতো উড়ে যাচ্ছিল, তখনও তিনি নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি। অটল প্রত্যয় নিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—”জয়ী আমি হবই”।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জীবনের লক্ষ্য স্থির করে ফেলেন তানভীর। স্নাতক শেষ করেই ভর্তি হন এমবিএ-তে। এমবিএ পড়া অবস্থাতেই শুরু করেন কর্মজীবন। অসাধারণ দক্ষতা ও পরিশ্রমের জোরে প্রথম বছরেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে পান কাজের সুযোগ। সেলস ও বিজনেস ডেভেলপমেন্টে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ‘জিএমআই’তে বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন।
সেলস লিডারশিপ থেকে খুব দ্রুতই তাঁর ক্যারিয়ার মোড় নেয় আন্তর্জাতিক বিজনেস লিডারশিপে। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের আচরণ বুঝে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তিনি অনন্য মেথড বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। আন্তর্জাতিক এফএক্স ব্যবসায় ক্লায়েন্ট একুইজিশন, পার্টনার নেটওয়ার্ক এবং রেভিনিউ গ্রোথের চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি নিজের নেতৃত্বের প্রমাণ দেন।
এরপর বিশ্ব ফিনটেক জায়ান্ট ‘ওয়ান রয়্যাল’-এ (OneRoyal) সিনিয়র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে ISC, South East Asia এবং MENA অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক এক্সপো, মিডিয়া ফোরাম ও ইন্ডাস্ট্রি ইভেন্টে প্রতিনিধিত্ব করে নিজের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘জারা এফএক্স’-এর (Zara FX) সেলস ডিরেক্টর এবং ‘ডিবি ইনভেস্টিং’-এর (DB Investing) চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে যোগ দেন।
দক্ষতার ধারাবাহিকতায় দ্রুতই তিনি ‘গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার – গ্লোবাল বিজনেস স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অপারেশনস’ পদে উন্নীত হন। MENA, SEA, ISC ও LATAM-সহ বিশ্বের একাধিক মহাদেশ ও দেশের বাজার সম্প্রসারণ এবং স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের দায়িত্ব চলে আসে তাঁর কাঁধে। ফিনটেক ওয়ার্ল্ডে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য আইকন।
২০২৫ সালে সাময়িকী ‘ফোর্বস মিডল ইস্ট’-এর পাতায় একজন প্রভাবশালী ফিনটেক লিডার হিসেবে নাম উঠে আসে সৈয়দ তানভীর আহমেদের। আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের কৌশল, অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন প্রজন্মের ট্রেডারদের নিয়ে তাঁর চিন্তা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
একসময় ঢাকায় যাঁর থাকার কোনো জায়গা ছিল না, ফুটপাতে রাত কাটাতে হয়েছে—সেই তরুণ আজ বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের নতুন দুয়ার উন্মোচন করছেন, পথ দেখাচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের। প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে বিশ্ব জয় করা এই ফিনটেক ইয়াং লিডার আজ তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
