
ঢাকা,১৩ সেপ্টেম্বর- শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই জানানো হবে। আপাতত প্রাথমিক যাচাই চলছে।
এর অর্থ এই নয় যে কোনো চুক্তি ইতোমধ্যে বাতিল করা হচ্ছে। চিফ হুইপ বলেননি, কোন চুক্তি বহাল থাকবে, কোনটি সংশোধন করা হবে কিংবা কোনটি বাতিল হতে পারে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইউএনবি, এনটিভি ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে মূলত একই তথ্য এসেছে। ফলে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিত বিষয় হলো, পর্যালোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পর্যালোচনার ভিত্তি হিসেবে জাতীয় স্বার্থের কথা বলা হয়েছে। চিফ হুইপ জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে, তবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর অর্থ, আগের সমঝোতাগুলো নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। কোন চুক্তিতে সমস্যা রয়েছে, তা সরকার এখনো বিস্তারিতভাবে জানায়নি। তাই ১০১টি চুক্তিকে একসঙ্গে স্বার্থবিরোধী বলা তথ্যসম্মত হবে না। এ বিষয়ে সরকারের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এখনই কেন এসব চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে? এর একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হলো সরকার পরিবর্তনের পর আগের আমলের নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে মূল্যায়নের উদ্যোগ। তবে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার একমাত্র কারণ হিসেবে সরকার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা উল্লেখ করেনি। তাই শেখ হাসিনা সরকারের সময় নেওয়া পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোর পুনর্মূল্যায়নকে প্রধান প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা যায়। এটিই আপাতত সবচেয়ে সতর্ক ব্যাখ্যা।
চট্টগ্রাম বন্দর প্রসঙ্গে চিফ হুইপ একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময়ে এমন ব্যবস্থা ছিল, যেখানে বাংলাদেশি জাহাজ এবং একটি বন্ধুদেশের জাহাজ একই সময়ে এলে বন্ধুদেশের জাহাজ আগে খালাসের সুযোগ পেত। তবে তিনি সংশ্লিষ্ট চুক্তির নাম, ধারা বা নথি প্রকাশ করেননি। সরকারি নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
মোংলা বন্দরের প্রসঙ্গও সাংবাদিকদের প্রশ্নে এসেছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ব্যবস্থা বাতিল বা পরিবর্তন হতে পারে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে চিফ হুইপ বলেন, ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও এমওইউ পর্যালোচনায় রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্দরচুক্তি বাতিলের ঘোষণা তিনি দেননি। আপাতত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর ইতিহাসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ৬ জুন ২০১৫ বাংলাদেশ ও ভারত এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে। পরে ২৫ অক্টোবর ২০১৮ চুক্তি এবং ৫ অক্টোবর ২০১৯ বাস্তবায়নসংক্রান্ত এসওপি সই হয়। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহন সহজ করা। এ তথ্য সরকারি নথিতেও রয়েছে।
ভারতের সরকারি নথি অনুযায়ী, এই বন্দর ব্যবস্থার মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও মোংলা ব্যবহার করে ভারতের পণ্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রথম পরীক্ষামূলক কনটেইনার পরিবহন হয়। ফলে ব্যবস্থাটি শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ, বন্দর ব্যবহার এবং বাংলাদেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এর সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিষয়টিও সম্পর্কিত।
তবে এই বন্দরচুক্তি নিজেই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী—এমন কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো নেই। বরং পর্যালোচনায় প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশ কী অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে, ব্যবহারের বিপরীতে ফি ও অন্যান্য আয় যথাযথ কি না, অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপের জন্য ক্ষতিপূরণ হচ্ছে কি না এবং ব্যবস্থাটি দুই দেশের জন্য বাস্তবে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ। এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক হিসাব ও যাচাই প্রয়োজন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান—এসব বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্ককে সংবেদনশীল করেছে। তবে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার সরাসরি কারণ হিসেবে সরকার এসব বিষয়ের কোনো একটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেনি। তাই এগুলোকে প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা উচিত, কারণ হিসেবে নয়।
পানি ইস্যুও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা। ফলে চলতি বছর পানি কূটনীতি স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। কিন্তু গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার সরাসরি প্রশাসনিক সম্পর্কের কথা সরকার বলেনি। তাই দুটি বিষয়কে আলাদা রেখেই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞতাও চুক্তি পুনর্মূল্যায়নে প্রাসঙ্গিক। আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নিয়ে মূল্য, শর্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার-নিযুক্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি চুক্তিতে অতিরিক্ত মূল্য এবং প্রক্রিয়াগত অনিয়মের বিষয়ে উদ্বেগ জানায়। তবে আদানি চুক্তি ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর্যালোচনার অংশ—এমন তথ্য নেই। দুটি বিষয়কে এক করা ঠিক হবে না।
আরেকটি বিষয় হলো, এই পর্যালোচনা ভারত সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে হচ্ছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘোষণা এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে চিফ হুইপের বক্তব্য থেকে। কোনো ভারতীয় মন্ত্রণালয়, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তাই এটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন হিসেবেই বর্ণনা করা নিরাপদ। এটি এখনো চলমান একটি প্রক্রিয়া।
১০১টি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিটি চুক্তির নাম, স্বাক্ষরের তারিখ, মেয়াদ, আর্থিক দায়, বাস্তবায়নের অবস্থা কিংবা সম্ভাব্য সমস্যার বিস্তারিত তালিকা নেই। ফলে কোন চুক্তি নিয়ে সরকার আপত্তি তুলেছে, কোনটি সংশোধনের জন্য বিবেচিত হচ্ছে অথবা কোনটি বহাল থাকবে—এসব বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট দাবি করা নিরাপদ নয়।
এ বিষয়ে আপাতত কোনো যৌথ ঘোষণাও নেই।
পর্যালোচনার ফলাফল প্রকাশিত হলে প্রতিটি চুক্তি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি হবে। দেখতে হবে, বাংলাদেশের কী সুবিধা নির্ধারিত ছিল, বাস্তবে কতটা পাওয়া গেছে, কী আর্থিক বা অবকাঠামোগত ব্যয় হয়েছে এবং চুক্তিতে পারস্পরিকতার নীতি কতটা বজায় আছে। একই সঙ্গে সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, বন্দর, পানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। এতে পরবর্তী সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্পষ্ট হবে।
তাই মূল প্রশ্ন শুধু কেন পর্যালোচনা হচ্ছে, তা নয়; কী পর্যালোচনা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি দলিলের শর্ত, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, বাস্তবায়নের অগ্রগতি, আর্থিক দায়, সুবিধা এবং প্রত্যাহার বা সংশোধনের আইনি সুযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে মেয়াদ, নবায়ন, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একতরফা প্রত্যাহারের বিধান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় ছাড়া পর্যালোচনার মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থাকবে।
প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো, সরকার শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও এমওইউ পর্যালোচনা করছে। কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা হয়নি। তাই এটিকে সিদ্ধান্ত নয়, বরং যাচাইপর্ব হিসেবে দেখা উচিত। এটাই প্রকাশিত তথ্যের সীমা।
সুতরাং উদ্যোগটিকে হঠাৎ বলা পুরোপুরি যথার্থ নয়। ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম ১০১টির সংখ্যা প্রকাশ্যে এলেও বন্দর, পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্নগুলো দীর্ঘদিনের। বর্তমান সরকার সেগুলোকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর্যালোচনার মধ্যে এনেছে। পরীক্ষা হবে তালিকা, দলিল, অর্থনৈতিক হিসাব এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর। তার আগে অনুমান নয়, তথ্যই ভিত্তি হওয়া উচিত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এস এম/ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

