
একটি বিস্ফোরণ, তারপর আরেকটি। এরপর একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ। কোথাও থানার সামনে, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে, কোথাও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি। এর মধ্যে রাজধানীর কাফরুলে একটি বাসে আগুন।
শুক্রবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক এসব ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে রাজধানীর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। বিশেষ করে মাত্র এক সপ্তাহ আগে গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের পরও কীভাবে একই ধরনের ঘটনা রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘটল, সেটিই এখন আলোচনায়।
১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পরদিন শনিবার নিরাপত্তা জোরদার করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও প্রবেশপথে দুই শতাধিক বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়।
মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হামলা বা নাশকতার পর চেকপোস্ট বাড়ানোই কি যথেষ্ট? নাকি আগেই পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য, সিসিটিভি নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করার ব্যবস্থায় কোথাও ঘাটতি ছিল?
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মালিবাগ রেলগেটসংলগ্ন এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের খবর আসে। এরপর সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ের বেতার ভবনের সামনে এবং মহাখালী এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান ফটকের সামনে বিস্ফোরণের পর কাছাকাছি যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় আরও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একজন অটোরিকশাচালক আহত হন।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, উড়ালসড়কের ওপর থেকে নিচে ককটেল ছোড়া হয়ে থাকতে পারে।
এরপর রাতে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে, মগবাজার চৌরাস্তা ও রামপুরায়ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। কাফরুল থানার সামনে একটি ফাঁকা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
অর্থাৎ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বিস্ফোরণ হিসেবে দেখার পাশাপাশি একই দিনের ধারাবাহিকতা হিসেবেও তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে সব ঘটনার পেছনে একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠী রয়েছে।
ঘটনাগুলোর স্থান বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় চোখে পড়ে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পুলিশ স্থাপনা অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি।
মহাখালী, আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, বাবুবাজার, মগবাজার ও রামপুরার মতো ব্যস্ত এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে বিস্ফোরণ এবং রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনে বিস্ফোরণের ঘটনা বিশেষভাবে নজরে এসেছে।
এখন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এসব জায়গা কি কেবল জনসমাগম ও দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার কারণে বেছে নেওয়া হয়েছিল, নাকি নির্দিষ্ট কোনো স্থাপনা বা নিরাপত্তাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করেই জায়গাগুলো নির্বাচন করা হয়েছিল? এর উত্তর এখনো মেলেনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের দিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি ও তল্লাশি বাড়ানোর ফলে জনমনে স্বস্তি ফিরেছে বলেও দাবি করেন ডিএমপি কমিশনার।
এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার গুলশান-১ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পরে পুলিশ দুই রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে।
ঘটনার পর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদ এবং গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে ওই ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে ১৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে ১৯ সেপ্টেম্বর ডিএমপি জানিয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী বলেন, শুক্রবারের ‘নাশকতা ও বিস্ফোরণ’-এর ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের দেখা হচ্ছে।
গুলশানের ঘটনার পর পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছিল। ফলে পরের শুক্রবার রাজধানীর একাধিক স্থানে একই ধরনের বিস্ফোরণ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও প্রবেশপথে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বসানো হয়েছে বলে ডিএমপি জানিয়েছে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তির শরীর এবং বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চলছে।
কিন্তু চেকপোস্ট মূলত বিস্ফোরণের পরের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। নাশকতার পরিকল্পনা, বিস্ফোরক বহন, সন্দেহভাজনদের চলাচল কিংবা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তাদের শনাক্ত করা এসবের জন্য প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি, সিসিটিভি বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের তথ্যের সমন্বয়।
পুলিশ বলছে, শুক্রবারের ঘটনাগুলোতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিস্ফোরণের আগে এসব এলাকায় সন্দেহজনক চলাচল বা প্রস্তুতির কোনো তথ্য নজরে এসেছিল কি না।
যদি এসে থাকে, সেই তথ্য মাঠপর্যায়ে পৌঁছেছিল কি না আর না এসে থাকলে কেন আসেনি তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শুক্রবারের কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, উড়ালসড়ক থেকে নিচে ককটেল ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। মালিবাগ ও মহাখালীর ঘটনায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে আরেকটি নিরাপত্তা প্রশ্ন সামনে এসেছে। রাজধানীর উড়ালসড়ক ও উঁচু সড়কগুলোর ওপর থেকে নিচের ব্যস্ত সড়কে বিস্ফোরক নিক্ষেপ ঠেকাতে কী ধরনের নজরদারি রয়েছে?
শুধু নিচের সড়কে পুলিশ মোতায়েন থাকলে ওপরের অংশ থেকে দ্রুত হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে যায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ উড়ালসড়ক, সেতু ও সংযোগস্থলকে আলাদা ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তে দেখা যেতে পারে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে শুক্রবারের সব বিস্ফোরণের পেছনে একই চক্র রয়েছে।
তবে সময়ের ব্যবধান কম, কয়েকটি ঘটনায় একই ধরনের কৌশলের প্রাথমিক তথ্য রয়েছে এবং ঘটনাগুলো রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘটেছে। এসব কারণে তদন্তকারীদের জন্য ঘটনাগুলোকে একটি সমন্বিত ধারাবাহিকতা হিসেবে পরীক্ষা করা জরুরি।
একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার সম্ভাবনাও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।
কারা বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে, কারা ঘটনাস্থলে গেছে, তারা কীভাবে যোগাযোগ করেছে, কোথা থেকে এসেছে এবং ঘটনার পর কোন পথে পালিয়েছে এসব তথ্য মিললে ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গুলশানের ঘটনার পর পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং ব্যাপক গ্রেপ্তার দেখিয়েছে যে ওই ঘটনার দায় ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়েছিল।
তার এক সপ্তাহের মধ্যে রাজধানীর একাধিক এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ হওয়ায় এখন মূল্যায়নের বিষয় হচ্ছে আগের ঘটনার পর কী ধরনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল এবং তার কোন অংশ মাঠে কার্যকর হয়েছে।
শুধু চেকপোস্ট বাড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে আগাম গোয়েন্দা তথ্য, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং থানা-পুলিশের সঙ্গে গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর সমন্বয় নিয়ে।
কারণ নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু ঘটনার পর চেকপোস্ট বসানো নয়; বরং ঝুঁকি চিহ্নিত করে ঘটনা ঘটার আগেই তা ঠেকাতে পারা।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

