পানি যখন ফ্যাশন আভিজাত্য আর বিশ্বব্র্যান্ড – DesheBideshe

পানি যখন ফ্যাশন আভিজাত্য আর বিশ্বব্র্যান্ড – DesheBideshe


পানি যখন ফ্যাশন আভিজাত্য আর বিশ্বব্র্যান্ড – DesheBideshe

পানি। পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত পানীয়। রং নেই, বিশেষ কোনো গন্ধ নেই, আকর্ষণীয় কোনো রেসিপিও নেই। অথচ সেই পানিই যখন গোলাপি ঢাকনার স্বচ্ছ একটি বোতলে ভরে বাজারে আসে, তখন তার দাম শুনে অনেকেরই চোখ কপালে ওঠে। বিশ্বের নামী হোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বিমানবন্দর পর্যন্ত দেখা মেলে এই পানির। সাধারণ বোতলজাত পানির পাশে এর দাম দেখলে তাই প্রশ্ন জাগতেই পারে, পানির আবার এত দাম কেন?

হ্যাঁ, সেই দাম দিয়েই মানুষ এই পানির বোতল ডাইনিং টেবিলে রাখতে চায়, সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে চায়। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ টেনিস টুর্নামেন্ট উইম্বলডনের Official Water হিসেবে রয়েছে এই পানি। একইভাবে US Open-এর সঙ্গেও তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই ব্র্যান্ডের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ এখানে পানি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পরিচয়ও।

এই পানির নাম Evian। ২০২৬ সাল Evian-এর জন্য বিশেষ একটি বছর। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর তার বোতলজাত পানির ২০০ বছর উদ্‌যাপন করছে। ১৮২৬ সালে Cachat Spring-এর কাছে প্রথম বোতলজাতকরণ চালু হয়েছিল। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত Evian-এর ইতিহাস দুই শতাব্দী পেরিয়ে এসেছে।

কিন্তু গল্পটির শুরু আরও আগে, ১৭৮৯ সালে। সালটি এমনিতেই ইতিহাসে বিখ্যাত। ওই বছরই শুরু হয়েছিল ফরাসি বিপ্লব। ফ্রান্সে তখন রাজনীতি উত্তাল, পুরোনো সমাজব্যবস্থা কাঁপছে। আর ঠিক সেই সময় আল্পসের পাদদেশের ছোট্ট এক শহরে অন্যরকম একটি ঘটনা ঘটছিল, যা পরে পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত পানির ব্র্যান্ডের জন্মকথা হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানটির নাম Évian-les-Bains, বাংলায় উচ্চারণ করলে ‘ইভিয়ান-লে-বাঁ’। ফরাসি ভাষায় ‘les bains’ বলতে স্নানাগার বা স্পা বোঝায়। নামটির মধ্যেই তাই শহরের পানি ও স্পা-ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে।

Evian-এর ইতিহাস অনুযায়ী, সেই এলাকায় একদিন হাঁটছিলেন মার্কি দ্য লেসের (Marquis de Lessert) নামে পরিচিত স্থানীয় এক ফরাসি অভিজাত ব্যক্তি। একসময় তৃষ্ণার্ত হয়ে তিনি কাছের একটি ঝরনা থেকে পানি পান করেন। পানিটি তাঁর এত ভালো লাগে যে এরপর তিনি নিয়মিত সেখানে ফিরে আসতে শুরু করেন। আর এখান থেকেই শুরু হয় Evian-এর সবচেয়ে বিখ্যাত কিংবদন্তি।

ঐতিহাসিক বিবরণে জানা যায়, Marquis তখন কিডনি ও লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনিতে তাঁর কিডনিতে পাথর ও ব্যথার কথাও পাওয়া যায়। নিয়মিত এই ঝরনার পানি পান করার পর নাকি তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। এরপর তিনি পরিচিত চিকিৎসক ও অভিজাত মহলে ঝরনাটির পানির কথা বলতে শুরু করেন। খবরটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর মানুষও আসতে শুরু করে সেই ‘বিশেষ’ পানি পান করতে। ব্যবসার ইতিহাসে কখনও কখনও একটি কিংবদন্তিই একটি ব্র্যান্ডকে প্রথম ধাক্কায় এগিয়ে নিয়ে যায়। Evian-এর ক্ষেত্রেও সম্ভবত তাই হয়েছিল।

যে ঝরনা থেকে Marquis পানি পান করেছিলেন, সেটি ছিল মঁসিয়ে কাশা (Monsieur Cachat) নামে এক ব্যক্তির জমিতে। তাঁর নাম থেকেই পরে ঝরনাটি পরিচিত হয় Cachat Spring।

পানির সুনাম ছড়িয়ে পড়তেই Cachat বিষয়টির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বুঝতে দেরি করেননি। স্থানীয় মানুষের কাছে পানি বিক্রি শুরু করলেন। মানুষ শুধু পানি পান করতে নয়, পানিতে শরীর ডুবিয়ে এর কথিত উপকার পাওয়ার আশাতেও আসতে লাগল। ১৮০৬ সালে সেখানে প্রথম thermal spa চালু হলো। আর ১৮২৬ সালে তৈরি হলো প্রথম বোতলজাতকরণ স্থাপনা। কিন্তু Evian-এর সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি আসলে মানুষের নয়, পানির।

ফরাসি আল্পসের পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি ও তুষারপাতের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়। পানি সঙ্গে সঙ্গে ঝরনায় এসে পড়ে না। হিমবাহের তৈরি বালি, পাথর ও বিভিন্ন ভূস্তরের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামে। প্রকৃতির এই বিশাল ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে উৎসে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ১৫ বছর। অর্থাৎ আজ কেউ দোকান থেকে যে Evian কিনে পান করছেন, সেই পানির যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে, সম্ভবত তখন তিনি এই বোতলটি কেনার কথাও ভাবেননি।

একটি শিশুর জন্ম থেকে কিশোর হয়ে ওঠার প্রায় সমান সময় ধরে প্রকৃতি সেই পানি মাটির নিচে ঘুরিয়ে, ছেঁকে, বিভিন্ন ভূস্তরের ভেতর দিয়ে নিয়ে এসেছে। পথে স্বাভাবিকভাবেই পানিতে বিভিন্ন খনিজ উপাদান যুক্ত হয়েছে।

Evian কোনো কারখানায় বিশেষ ফর্মুলা মিশিয়ে বানানো পানি নয়। এটি প্রাকৃতিক উৎসের পানি। বোতলে ঢোকার আগে এর সঙ্গে আলাদা করে কোনো ‘উপাদান’ যোগ করা হয় না। তার বিশেষত্ব তৈরি হয় উৎস, ভূস্তর এবং দীর্ঘ প্রাকৃতিক যাত্রায়। আর সেই উৎসের গল্পকেই পরে Evian অসাধারণভাবে ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।

একসময় ইউরোপের অভিজাতদের কাছে Évian-les-Bains জনপ্রিয় স্পা শহরে পরিণত হয়। হোটেল, অবকাশকেন্দ্র, স্পা, ক্যাসিনো, পর্যটন, সব মিলিয়ে জায়গাটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। এ পানির পরিচয় আভিজাত্যের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। তারপর Evian পাড়ি দেয় আরও দূরে।

উত্তর আমেরিকায় এর প্রবেশ ঘটে ১৯৭৮ সালে। Danone Waters of America যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজারে Evian নিয়ে আসে। এরপর গোলাপি ঢাকনার বোতলটি ধীরে ধীরে হোটেল, রেস্তোরাঁ, সুপারমার্কেট এবং উচ্চমানের খাবারের টেবিলে পরিচিত দৃশ্য হয়ে ওঠে। এখানেই Evian অন্য অনেক পানির ব্র্যান্ডকে পেছনে ফেলার কৌশল দেখিয়েছে। পানি বিক্রি করার বদলে তারা একটি জীবনধারা বিক্রি করতে শুরু করে।

বছরের পর বছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিজাইনার ও শিল্পী Evian-এর বিশেষ সংস্করণের বোতল ডিজাইন করেছেন। কোনো কোনো বোতল তাই পানি শেষ হওয়ার পর আবর্জনায় না গিয়ে সংগ্রহে থেকে গেছে।

২০২৬ সালে দুইশ বছর পূর্তিতেও Evian সেই কাজটিই করেছে। বিখ্যাত মার্কিন শিল্পী Jeff Koons-এর সঙ্গে মিলে বিশেষ সংস্করণের বোতল তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একটি সাধারণ পানির বোতলকে তারা আক্ষরিক অর্থেই শিল্পবস্তু বানানোর চেষ্টা করেছে। ভাবলে ব্যাপারটি খুব মজার।

১৭৮৯ সালে এক তৃষ্ণার্ত মানুষ রাস্তার পাশের ঝরনা থেকে যে পানি পান করেছিলেন, দুইশ বছরের বেশি সময় পরে সেই পানির বোতল ডিজাইন করছেন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত সমকালীন শিল্পী।

এবার আসা যাক সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নে। এক বোতল Evian-এর দাম কত? দাম নির্ভর করে দেশ, দোকান, বোতলের আকারের ওপর। যুক্তরাজ্যের Tesco-তে এক লিটার Evian-এর দাম প্রায় ১.৪৫ পাউন্ড। কানাডার Metro-তে এটির দাম ৩.১৯ ডলার। বোতলের পানি যত দূরে যায়, তার দামের গল্পও তত বদলায়। Evian-এর দামের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য উপাদান পানি নয়, নাম।

পানির বোতলের গায়ে আল্পসের পাহাড়ের ছবি তাই নিছক অলংকার নয়। সেটিই আসলে ব্র্যান্ডটির সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

তথ্যসূত্র:
The Evian Story, 2026