
যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রের মাঝামাঝি নেব্রাস্কা। পূর্ব দিকে প্রেইরি অঞ্চল, পশ্চিমে বিস্তৃত গ্রেট প্লেইনস। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে প্ল্যাট নদী। মাঠ, খামার আর দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা খোলা আকাশের এই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী লিংকন। সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টারের ডেন্টাল কলেজে এখন বিদেশে শিক্ষিত দন্তচিকিৎসকদের জন্য একটি কর্মসূচি পরিচালনা করছেন বাংলাদেশের ডা. উপমা গুহ।
উপমার বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পরিবারের সঙ্গে শৈশবে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে পৃথিবীকে জানার আরেকটি দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু দন্তচিকিৎসার প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল ঘরের খুব কাছের এক অভিজ্ঞতা থেকে। বাবা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যেতেন। চিকিৎসা শেষে বাবার মুখে স্বস্তি দেখে ছোট্ট উপমা বুঝতে শুরু করেন, এই পেশায় মানুষের কষ্ট কমানোর কতটা সুযোগ আছে।
পড়াশোনার পরিবেশ ছিল পরিবারেই। উপমার মা-বাবা দুজনই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। দুই বোনের মধ্যে বড়জন শিল্পী, ছোটজন অর্থনীতিবিদ। তাঁর স্বামী পরিবেশ প্রকৌশল বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। পরিবারের এই পরিচয়ে শিক্ষা ও সৃজনশীলতার যে যোগ দেখা যায়, উপমার নিজের পেশাতেও তার ছাপ রয়েছে। তিনি চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শেখানো এবং নতুন শিক্ষা-পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন।
২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিডিএস ডিগ্রি অর্জন করেন উপমা। পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন। এরপর বাংলাদেশ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালে দন্তচিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। তত দিনে তিনি রোগীর পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা পেয়েছেন; সামনে ছিল আরও শেখার ইচ্ছা। ২০১০ সালে সেই ইচ্ছা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন।
এখানে এসে প্রথমে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনায় জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা কাজে যুক্ত হন। তারপর ফিরে যান নিজের মূল আগ্রহ দন্তচিকিৎসার উচ্চতর প্রশিক্ষণে। ২০১২ সালে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিলের অপারেটিভ ডেন্টিস্ট্রি কর্মসূচিতে যোগ দেন। তিন বছর পর সেখান থেকে অর্জন করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও ক্লিনিক্যাল সার্টিফিকেট। গবেষণা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর অধ্যবসায়ের পরিচয় মেলে এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রাতেই।
২০১৫ সালে উপমা শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোতে। ২০১৮ সালে যান ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের দাঁতের গঠন, চিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধের নানা বিষয় পড়িয়েছেন। পাঠদানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন পদ্ধতিও এনেছেন। রোগীর চিকিৎসা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকতা আর গবেষণা চলেছে পাশাপাশি। ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টারের ডেন্টাল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি।
নেব্রাস্কায় তাঁর দায়িত্ব দ্রুত বাড়ে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কলেজটির ক্লিনিকস পরিচালক হন। রোগীদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ক্লিনিকে কীভাবে কাজ শিখছেন, সেই বৃহৎ কার্যক্রমও তাঁর তত্ত্বাবধানে আসে। শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করতে করতেই ২০২৬ সালে একই কলেজ থেকে ডিডিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই বছরের জুলাইয়ে নেন আরেক দায়িত্ব: কলেজের অ্যাডভান্সড স্ট্যান্ডিং ডেন্টাল প্রোগ্রামের পরিচালক। একই সঙ্গে তিনি অ্যাডাল্ট রেস্টোরেটিভ ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন।
এই কর্মসূচি বিদেশে দন্তচিকিৎসার ডিগ্রি অর্জনকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে ডিডিএস ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ দেয়। বিদেশ থেকে এসে নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় নিজেকে গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা উপমার নিজেরও আছে। ফলে কর্মসূচিটির শিক্ষার্থীদের পথ তাঁর কাছে পরিচিত। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দক্ষ দন্তচিকিৎসকদের পেশাগত জীবন এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে এই কর্মসূচি।
উপমার কাজের স্বীকৃতি এসেছে শ্রেণিকক্ষ ও কলেজের বাইরেও। তিনি আমেরিকান ডেন্টাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। ডেন্টাল শিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সাময়িকীতে। ২০২৩ সালে Academy of Operative Dentistry-র নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে UNMC। সে সময় উপমা বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, একই সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশকেও।
তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা মেডিকেল সেন্টার (UNMC)




