সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন – DesheBideshe

সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন – DesheBideshe


সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার কবি অ্যান কারসন – DesheBideshe
কানাডার কবি অ্যান কারসন

স্টকহোম থেকে যখন ফোনটি এলো, অ্যান কারসন তখন আইসল্যান্ডে বাতাসের শব্দ শুনছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি জানলেন, ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অধ্যয়ন, শিক্ষকতা এবং কবিতা ও গদ্যের প্রচলিত সীমানা পেরিয়ে লেখালেখি তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান। ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সুইডিশ একাডেমি টরন্টোয় জন্ম নেওয়া এই কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদকের নাম ঘোষণা করে। একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ জানান, খবরটি শুনে কারসন বিস্মিত হয়েছেন, আনন্দিতও হয়েছেন।

কারসনের সাহিত্যকর্মকে সাহসী ও উদ্ভাবনী হিসেবে মূল্যায়ন করেছে সুইডিশ একাডেমি। তাদের বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, ধ্রুপদি সাহিত্যের সঙ্গে সৃষ্টিশীল আলাপের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন সাহিত্যে নতুন প্রকাশরীতি গড়ে তুলেছেন। তাঁর লেখায় বহু শতাব্দী আগের কবিতা, পুরাণ ও দর্শন ফিরে আসে বর্তমান মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, শোক এবং আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ফলে পুরোনো কাহিনি তাঁর হাতে নতুন জীবনের ভাষা পায়।

কানাডার সাহিত্যজগতে এই অর্জনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ২০১৩ সালে ছোটগল্পকার অ্যালিস মুনরোর নোবেলপ্রাপ্তির ১৩ বছর পর আবার এই সম্মান পেলেন একজন কানাডীয় লেখক। কারসন কানাডায় জন্ম নেওয়া তৃতীয় সাহিত্য নোবেলজয়ী। অন্য দুজন হলেন ১৯৭৬ সালের বিজয়ী সল বেলো এবং ২০১৩ সালের বিজয়ী অ্যালিস মুনরো। তবে বেলো শৈশবেই যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং মার্কিন লেখক হিসেবে পরিচিতি পান।

নারী লেখকদের স্বীকৃতির ইতিহাসেও যুক্ত হলো তাঁর নাম। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরুর পর কারসন সাহিত্যে এই সম্মান পাওয়া ১৯তম নারী। তাঁর এই অর্জন একই সঙ্গে কবিতা, অনুবাদ এবং সাহিত্য নিয়ে পরীক্ষা করার দীর্ঘ সাধনাকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন টরন্টোয়। বয়স এখন ৭৬। প্রাচীন গ্রিক ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়। এক লাতিন শিক্ষক দুপুরের বিরতিতে তাঁকে গ্রিক শেখাতে শুরু করেছিলেন। স্কুলজীবনের সেই পরিচয় পরে তাঁর শিক্ষা ও সৃষ্টিশীল জীবনের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৭৪ সালে স্নাতক, ১৯৭৫ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮১ সালে পিএইচডি অর্জন করেন।

লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘ সময় কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। ১৯৮৮ সালে তিনি মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুপদি সাহিত্য বিভাগে যোগ দেন। ২০০০ সালে সেখানে জন ম্যাকনটন প্রফেসর অব ক্লাসিকস পদে নিযুক্ত হন। ২০০২ সালে ম্যাকগিল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রাচীন ভাষার শিক্ষক এবং নতুন সাহিত্যরীতির অনুসন্ধানী লেখক, এই দুই পরিচয় তাঁর কাজের মধ্যে পাশাপাশি এগিয়েছে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নোবেলপ্রাপ্তিকে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের গর্বের উপলক্ষ হিসেবে অভিহিত করেছে।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত Eros the Bittersweet তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাজ। গ্রিক সাহিত্যের আলোকে এই বইয়ে তিনি আকাঙ্ক্ষার আনন্দ ও যন্ত্রণার সম্পর্ক অনুসন্ধান করেন। ভালোবাসার অভিজ্ঞতায় পাওয়া ও না পাওয়ার যে টানাপোড়েন থাকে, সাহিত্য বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সেটিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি। গবেষণার বিষয়কে সৃষ্টিশীল লেখার উপাদানে পরিণত করার যে প্রবণতা পরে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে, এই বইয়েই তার সন্ধান পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত বইগুলোর একটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত Autobiography of Red। পদ্যে লেখা এই উপন্যাসে গ্রিক পুরাণের চরিত্র গেরিয়নের কাহিনি আধুনিক এক তরুণের বেড়ে ওঠা, আকাঙ্ক্ষা ও হৃদয়ভাঙার অভিজ্ঞতায় নতুন রূপ পেয়েছে। পুরাণের চরিত্রকে দূর অতীতের মধ্যে আটকে রাখার বদলে কারসন তাকে বর্তমানের আবেগ ও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। কবিতা ও উপন্যাসের মেলবন্ধন বইটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।

২০০১ সালে প্রকাশিত The Beauty of the Husband: A Fictional Essay in 29 Tangos তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। একটি বিবাহের ভাঙনকে কেন্দ্র করে লেখা বইটি ২৯টি ‘ট্যাঙ্গো’ পর্বে সাজানো। এই কাজের জন্য তিনি ২০০১ সালের টি এস এলিয়ট পুরস্কার পান এবং পুরস্কারটির প্রথম নারী বিজয়ী হন। কবিতা, আখ্যান ও প্রবন্ধকে একই রচনায় মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।

ব্যক্তিগত শোকও তাঁর হাতে পেয়েছে অভিনব প্রকাশ। ২০১০ সালে প্রকাশিত Nox রচিত হয়েছে দীর্ঘদিন দূরে থাকা এবং পরে মারা যাওয়া ভাই মাইকেলের স্মৃতিকে ঘিরে। একটি বাক্সের ভেতর ভাঁজ করা দীর্ঘ কাগজে ছবি, চিঠি ও লেখার সমাবেশ ঘটিয়ে তৈরি হয়েছে বইটি। এতে রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা শোককবিতার অনুবাদও রয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৯ সালের Norma Jeane Baker of Troy গ্রিক পুরাণের হেলেনের সঙ্গে মেরিলিন মনরোর জীবনকে পাশাপাশি এনেছে। কারসনের সাহিত্য এভাবেই কখনও বইয়ের পাতা, কখনও দৃশ্যশিল্প, কখনও মঞ্চের সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়েছে।

নোবেলের আগেও তাঁর কাজ বহুবার সম্মানিত হয়েছে। দুটি গ্রিফিন পোয়েট্রি পুরস্কার, প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কার এবং পেন/নাবোকভ পুরস্কারের পাশাপাশি পেয়েছেন গুগেনহাইম ও ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ। ২০০৫ সালে তাঁকে অর্ডার অব কানাডার সদস্য করা হয়। এসব স্বীকৃতির পরও তিনি নিজের লেখার ধরন নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন।

আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানিত করা হবে। এবারের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। টরন্টোয় জন্ম নেওয়া সেই গ্রিক সাহিত্যের শিক্ষার্থীর নাম এখন বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত লেখকদের তালিকায়। তাঁর অর্জন মনে করিয়ে দেয়, অতীতের সাহিত্যকে গভীরভাবে পড়ার মধ্যেও ভবিষ্যতের লেখার পথ খুঁজে পাওয়া যায়। বহু পুরোনো কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই অ্যান কারসন তৈরি করেছেন নিজের স্বতন্ত্র ভাষা।

তথ্যসূত্র: সুইডিশ একাডেমি, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস