
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম (বামে), বন্ধু শাহরিয়ার দ্বীপ (ডানে)
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে টানা ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো বন্ধুস্থানীয় তরুণ শাহরিয়ার দ্বীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তারা দুজন উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কী ঘটেছিল, কীভাবে তারা আলাদা হয়ে গেলেন এবং পরে তাহসিফের মরদেহ তুরাগ নদে পাওয়া গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
তবে দ্বীপের দাবি, কিছু লোকের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তিনি নিজে সেখান থেকে পালিয়ে যান। বন্ধুর এই বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তার দাবি, ছেলের মৃত্যুর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নৌ পুলিশের পাশাপাশি পিবিআইও ছায়াতদন্ত শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে শাহরিয়ার দ্বীপকে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। রাতভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট করেনি সংস্থাটি।
শুক্রবার পিবিআই দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নিশ্চিত করে। পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ বলেছেন, ‘আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ ভাই নদীতে ঝাঁপ দেন। আর আমি পালিয়ে আসি।’
ওই কর্মকর্তা জানান, দ্বীপের এই বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযানও চালানো হয়েছে।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল বলেন, দ্বীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, “ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকাটি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত। মাদক কারবারিদের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদে পড়ে ডুবে মারা যেতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
তবে তাহসিফ বা দ্বীপ ওই এলাকায় আগে কখনও গিয়েছিলেন কি-না, তা এখনও জানা যায়নি।
পিবিআইয়ের ঢাকার মহানগর উত্তর বিভাগের ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, “তাহসিফ মাদকাসক্ত ছিলো কি-না তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে।”
‘ছেলে সাঁতার জানত, ধাওয়ার গল্প বিশ্বাস করি না’
দ্বীপের দেওয়া বক্তব্য মানতে নারাজ তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। শুক্রবার সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, ‘না না, এ ধরনের কিছু হতে পারে না। কেন তাকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না।’
ছেলের সাঁতার জানা এবং প্রশিক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সাঁতার জানত। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের।’
ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে তো এটাই মনে হয়। আর ওকে ধাওয়া দেবে কেন লোকজন? কেন তাকে কেউ ধাওয়া দেবে? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’
উত্তরা থেকে টঙ্গী, মাঝপথে কী ঘটেছিল?
শুক্রবার দুপুরে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের ইন্সপেক্টর সাজেদুর রহমান। তিনি জানান, দ্বীপ বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে করে দুজন টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় আসেন। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করেন। একপর্যায়ে তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে দ্বীপ তাকে খোঁজাখুঁজি করেন। পরে না পেয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান।
সাজেদুর রহমান বলেন, ‘এখানে তারা দুজনই এসেছিলেন। অন্য কেউ তাদের সঙ্গে ছিলেন না। উত্তরা থেকে ঘোরার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে করে তারা এখানে আসেন বলে দ্বীপ জানিয়েছেন। তবে এখানে আসার পর কী ঘটেছিল, কোথায় গিয়েছিলেন কিংবা কী কারণে তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলো, সেসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন।’
দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট ও ইঞ্জিন নম্বর যাচাই করে মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের অমিল
এর আগে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার রাতের বিবরণ দিয়েছিলেন দ্বীপ। তার দাবি ছিল, তাহসিফের সঙ্গে তিনি একটি গ্যারেজে গিয়েছিলেন। পরে রাতে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া শেষে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হয়ে যান। বাসায় ফিরে তাহসিফকে ফোন দিলে তার মোবাইল বন্ধ পান।
কিন্তু পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে এবার সামনে এসেছে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার তথ্য এবং ধাওয়ার মুখে তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবি। আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের এই পার্থক্য কেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের আগপর্যন্ত কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে দ্বীপের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করছে পিবিআই। তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দ্বীপের দেওয়া তথ্য সরেজমিনে যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে নেওয়া হয়। বিকেল ৪টায় রুয়াপ কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা অংশ নেন। পরে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নদী পুলিশ। মরদেহের কাছে থাকা আইফোন ও হাতঘড়ি দেখে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




