ফুটপাতে থাকা সব মানুষই কি অসহায়? | সময় স্পেশাল

ফুটপাতে থাকা সব মানুষই কি অসহায়? | সময় স্পেশাল

<![CDATA[

শুনলে হঠাৎ করে বিশ্বাস হবে না। রাজধানীর নিম্নবিত্তের অনেকেই আজকাল বাসস্থান হিসেবে বেছে নেন ফুটপাতকে। সারাদিন জীবিকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো এসব মানুষ বেলা শেষে পোস্টার, বস্তা কিংবা চটি বিছিয়ে শুয়ে পড়েন ব্যস্ততম সড়কের কোনো এক ফুটপাতে। কিন্তু ফুটপাতে থাকা মানুষেরা আসলে কতটা অসহায়, তাদের দৈনিক বা মাসিক আয় কেমন, কেন তারা ফুটপাতে থাকেন- এমন প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খায়।

রাজধানীর বাসস্টেশন ও রেলস্টেশনের মতো জায়গায় রাতের বেলা অহরহ এসব ভাসমান মানুষের দেখা মেলে। পাশাপাশি শহরের নানা ব্যস্ততম সড়কের ফুটপাত ও ওভারব্রিজেও রাতের বেলা ভাসমান এসব অস্থায়ী মানুষের আবাসের দৃশ্য রাজধানীবাসীর জন্য নতুন কিছু না।

সরেজমিনে মিরপুর-১ এর চাইনিজে দেখা যায় ফুটপাতে শুয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। যাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। দিনে মজুরের কাজ করেন। রাতে এসে ফুটপাতে ঘুমান।

 

ফুটপাতে ঘুমানো এসব মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এদের অনেকের পরিবারই ঢাকার বাইরে থাকেন। গ্রামে কাজ করে বেশি টাকা পাওয়া যায় না বলে ঢাকা এসেছেন। অতি সাধারণ কিসিমের কাজ করলেও ঢাকায় মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং ক্ষেত্রেবিশেষে এর বেশিও আয় করা যায় বলে জানান তারা।

 

No description available.
রাজধানীর মিরপুর-১-এর ফুটপাতে রাতে ঘুমিয়ে আছেন ঘরবাড়িহীন মানুষেরা। ছবি: আবু সাঈদ নিশান

 

এমনই একজন দিনমজুর জব্বার মিয়া। লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর কোলঘেঁষে তার বাড়ি। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসেছেন। সময় সংবাদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমার ঢাকায় কেউ নাই। বউ বাচ্চা দেশত থাকে। বাড়িতে মাটি কাটা, অন্যের জমিতে চাষ করার কাজ করতাম। ওই দিয়ে সংসার চলতো না। তাই ঢাকায় আইছি। থাকার জায়গা নাই দেইখা ফুটপাতে থাকি।’

 

কী ধরনের কাজ করেন, জানতে চাইলে জব্বার বলেন, ‘যা পাই তাই করি। বেশিরভাগ সময় বিল্ডিংয়ের কাম করি। ফ্যাক্টরিগুলাতেও অনেক কাম থাকে। ওইখানেও যাই। রাজমিস্ত্রির কাম, বাসা বাড়ি বদলের কাম। সব ধরনের কামই করি।’

 

কাজগুলো কীভাবে পান জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ভোর হলেই মিরপুর-১ নম্বরের ওভারব্রিজের নিচে আমরা জড়ো হই। এইখানে যাগোরে দেখতাছেন সবাই ওইখানে যায়। যাদের লেবার লাগে তারা ওইখানে আইসা যার যার প্রয়োজন মতো লোক লইয়া যায় কামে। কন্ট্রাক্টররা থাকে। লোকাল লোকজনও থাকে। এই গেল শীতে কলোনির কিছু পোলাপান আইছিল। ওগো র‍্যাকেট (ব্যাডমিন্টন) খেলার কোর্ট কাটা লাগবো। আমি গেছিলাম। এমনেই কাম করি।’

 

মাসে কেমন আয় হয় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘মাসে কত হয় তা তো ওইভাবে হিসাব করি নাই বাবা। দিনে কামাই দিনের মধ্যেই খরচ কইরা ফালাই। কিছু টাকা বাড়িতে পাঠাই। দিনে ৭০০-৮০০ টাকা আসে। ২০০-৩০০ টাকা খরচ করি। বাকি টাকা হপ্তা শেষে বাড়িতে পাঠাই। তবে আমার থেকেও অনেকে আছে যারা বেশি আয় করে। বিশেষ কইর‍্যা যারা রঙের কাম করে তাগো দৈনিক হাজিরাই ১ হাজার টাকা।’

 

No description available.
রাজধানীর মিরপুর-১-এর ফুটপাতে রাতে ঘুমিয়ে আছেন ঘরবাড়িহীন মানুষেরা। ছবি: সময় সংবাদ

 

রাতের ঢাকায় ঘুরতে ঘুরতে মিরপুরেরই এমন এক ফুটপাতবাসী রফিক আলীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সময় সংবাদকে রফিক বলেন, ‘আমরা যারা রঙের বা রাজমিস্ত্রির কাজ করি তাগো হাজিরাই ১ হাজার টাকা। কাজ একটু কম জানলে ৬০০ টাকা। আবার বেশি ভালো কাজ জানলে ১ হাজার ২০০ টাকা। মাসে প্রতিদিন কাজ না থাকলেও ২০ দিনের মতো কাজ পাওয়া যায়।’

 

আয় ভালো হওয়ার পরও ফুটপাতে কেন থাকেন জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘আমরা এইখানে সেইখানে কাজ করি। একেকদিন একেক জায়গায় থাকা পড়ে। মেস বা বস্তিতে ছোট ঘর ভাড়া নিলে দেখা যাইবো ঘর পইড়া আছে কিন্তু আমার থাকার নাম নাই। যে দুই একদিন কাজ থাকে না বা কাজ রাইতের আগে শ্যাষ হইয়া যায় তখন আইসা ফুটপাতে ঘুমাই। এতে কইর‍্যা বাড়তি খরচও বাঁচে আবার বাড়িতেও বেশি টাকা পাঠানো যায়।’

 

এমনই আরেকজন দিনমজুর করিম শেখ। করোনার সময় যখন সব বন্ধ হয়ে আসে তখন কাজ কাম হারিয়ে বাড়িতে চলে যান। করোনার ভয়াবহতা কমে আসলে গেল বছর আবার ঢাকায় আসেন। এক বছর ধরে এইখানেই থাকেন। দিনমজুরের কাজ করেন।

তার বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হরিনগরে। তিনি বাড়ির এক সেলুনে চুল কাটার কাজ করতেন। ওইখানে কাজ করে সংসার চলতো না। পরে ঢাকায় আসেন। এখানে মিরপুর দিয়াবাড়ির দিকে ফ্যাক্টরিগুলোতে কাজ করেন। মাথায় করে ইট বালু সিমেন্ট এক জায়গা থেকে বয়ে আরেক জায়গায় নিয়ে যান।

করিম শেখের সঙ্গে সময় সংবাদের কথা হলে তিনি বলেন, ‘সারাদিন ম্যালা কষ্ট করতে হয়। তারপরও পেটের দায়ে করি। বাড়িতে বউ-বাচ্চা আছে। অগোর খাওন-দাওন, পড়ালেখা তো করাইতে হইবো। নিজে পড়ালেখা না কইরা পস্তাইতেছি।’

সংসার কি চালাতে পারেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘নাপিতের কাজ করে যে টাকা পাইতাম তাতে সংসার চলতো না। এই কাজে ৪০০-৫০০ টাকা পাই। খাওয়া ছাড়া আর খরচ নাই। থাকি তো ফুটপাতেই। থাকার খরচ বাঁচায়ে বাকি টাকা বাড়িতে পাঠাই। কষ্টমষ্ট করে চলে যায় আরকি।’

এইখানে থাকতে কাউকে কোনো চাঁদা দিতে হয় কি-না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘না, না। এইখানে থাকতে কাউকে টাকা দেয়া লাগে না। রাতে দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে এইখানে এসে ঘুমাই। আবার ভোরে উঠে চলে যাই। এই মাসে রমজান উপলক্ষে অনেকেই রাতের বেলা খাবার নিয়ে আসেন। প্রায় রাতেই কারও না কারও থেকে খাবার পাই। খাবার নিয়েও তেমন চিন্তা করতে হয় না।’

 

No description available.
দিনে মজুরের কাজ করে ক্লান্ত দেহে রাতে এভাবেই ফুটপাতে ঘুমিয়ে পড়েন তারা। ছবি: আবু সাঈদ নিশান

খাবার ছাড়া আর কিছু দেয় কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এই শীতের সময় কিছু ছেলেপেলে বাইকে করে এসে কম্বল দিয়ে গেছিল। পোলাপানগুলারে আল্লাহ হাজার বছর বাঁচায়ে রাখুক। শীতে ঘরহীন এইভাবে ফুটপাতে থাকতে বেশ কষ্ট। ওদের দেয়া কম্বলে ভালোভাবে থাকতে পারছিলাম।’

ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গাতেই এমন অনেক মানুষকে রাতে ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। এদের বেশিরভাগ মানুষই জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় এসেছেন। বিভিন্ন পেশায় দিনমজুরের কাজ করেন। অনেকে আবার মানসিক ভারসাম্যহীন। আবার কেউ কেউ নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেও এসব জায়গায় পড়ে থাকেন। বিশেষ করে যারা নেশা করেন তারা ফুটপাতবাসীদের কাছে উটকো ঝামেলা।

 

রাস্তায় থাকা মাদকাসক্তদের নিয়ে আরেক ফুটপাতবাসী আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘বাবা কইয়ো না! গাঞ্জা খাইয়া কতডি মাঝে মধ্যে কি নাচন কোদনটাই না করে। কতডি আছে আবার ড্যান্ডিখোর। খাইয়া সারাদিন ঝিমায়। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ যেগুলা ইঞ্জেকশন নেয়। এগুলা কাজ কাম করে না। নেশার গ্যাড়া উঠলে এইটা চুরি করে, এর লগে মারামারি করে, ওর লগে কাটাকাটি করে। ফুটপাতে সবঠিক আছে, খালি ডিস্টার্ব দেয় এই নেশুট্টা পোলাপানগুলান।’

 

রাতের ঢাকার ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, এখানে সবাই অসহায় এ কথা হলফ করে বলা যাবে না। তবে যারা অসুস্থ ও মাদকাসক্ত তাদের অবস্থা আসলেই করুণ। বাকিরা নানা ধরনের কাজ করে খেয়ে পরে ভালো আছেন। অনেকেই আবার গ্রামে টাকা পাঠিয়ে ভালো রাখছেন নিজের পরিবারকে।

]]>