পাকিস্তানের ভাগ্যে কি আছে? | আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানের ভাগ্যে কি আছে? | আন্তর্জাতিক

<![CDATA[

সংঘাত-সহিংসতা পাকিস্তানে নতুন কোনো ব্যাপার নয়। জন্ম থেকেই জ্বলছে দেশটি। কালেভদ্রে পাকিস্তানে কোনো সরকার তার মেয়াদ শেষ করার সুযোগ পায়। ইমরান খানও পাননি। তিনি ক্ষমতা হারালেন প্রথম। তারপর হলেন গ্রেফতার।

বেশ কয়েক বছর ধরেই সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পাকিস্তান। অর্থনৈতিক ধস ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা মিলিয়ে খাদের কিনারায় চলে গেছে দেশটি। যে কোনো সময় দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। এরইমধ্যে মঙ্গলবার (৯ মে) গ্রেফতার করা হয় দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সংকট আরও তীব্র হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ইমরান খান। আগাম নির্বাচনের দাবিতে শাহবাজ শরিফের সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছিলেন তিনি। সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার অভিযোগ পাল্টা-অভিযোগের খেলা চলছিল। এতে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।

 

সোমবার (৮ মে) এক বিবৃতিতে ইমরান খানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। বলেছিল, ‘পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধানের ভিত্তিহীন অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য।’ পরদিন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডন, বিবিসি, আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস ও ব্লুমবার্গ এমন খবর দিয়েছে।

 

ভিডিওতে দেখা গেছে, ইসলামাবাদ হাইকোর্টের সামনে থেকে আধাসামরিক বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্য তাকে একটি সাঁজোয়া যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পরমাণু শক্তিধর দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের একটি পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান।

 

তাকে গ্রেফতারের পর এক টুইটবার্তায় পিটিআই জানিয়েছে, এখন আমাদের, পাকিস্তানের জনগণের রাস্তায় নেমে আসার সময়। ইমরান খান সবসময় আপনাদের পাশে ছিলেন। এখন তার পাশে দাঁড়ানোর সময়।

 

এক টুইটবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দ্য সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল ক্লুগম্যান বলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এক অসহনীয় মুহূর্তে পৌঁছে গেছে। ইমরান খানকে পুলিশের কয়েক দফা ব্যর্থ গ্রেফতার চেষ্টার পর এখন সেনাবাহিনী বিষয়টি নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। একেবারেই বাজে অবস্থা!

 

পাকিস্তানের বর্তমান সংকটকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোথি। ইমরান খানের গ্রেফতারের ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, পুরোটাই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পতন। বর্তমান পরিস্থিতি একেবারে অসহনীয়। দেশের মানুষ এমনটি কখনো চায়নি। এ অবস্থা আর থাকতে পারে না। অবশ্যই পরিস্থিতি বদলাতে হবে।

 

আরও পড়ুন: সেনা সদর দফতরে ইমরান সমর্থকদের তাণ্ডব

 

যেভাবে ঘটনার শুরু

 

ইমরান খান ২০১৮ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তখন তাকে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও সমর্থন দিয়েছিল বলে দাবি। ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে যায় দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি।

 

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন ইমরান খান। এ দুই পক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণেই তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন বলে দাবি করেন। তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেরও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। শাহবাজ শরিফ ও যুক্তরাষ্ট্র সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

 

এরপর দুর্নীতি ও অসাংবিধানিক কার্যক্রমের অভিযোগ তোলা হয় ইমরান খানের বিরুদ্ধে। এতে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টেরও সমর্থন মেলে। মঙ্গলবার দুর্নীতির মামলাই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পিটিআই বলছে, এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা।

 

ইমরান খান যদি এভাবে অভিযোগ করেই যান, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র। গ্রেফতারের শঙ্কা থাকায় ইমরান খান বলেন, কারও হাতে যদি গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকে, তাহলে সেটি সরাসরি আমার কাছে নিয়ে আসা উচিত। পরোয়ানা নিয়ে আসেন, আমার আইনজীবীও থাকবে। আমি কারাগারে যেতে প্রস্তুত আছি।

 

এদিকে ইমরান খানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ প্রতিবাদ ডেকেছে তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি ও তার সমর্থকেরা। ২৩ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে এ ক্রিকেট কিংবদন্তির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। এর আগে ইমরান খান নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া কিংবা কোনো সরকারি পদে বসতে পারবেন না বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সরকারি যে কোনো পদের জন্য তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

 

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব আইনি জটিলতার কারণে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার প্রতিটি সমাবেশে মানুষের ঢল নামে। বিরোধীদের জন্য যা আতঙ্কের কারণ।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হবেন ইমরান খান। তার বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়া হবে।

 

কেবল পাকিস্তানেই না, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ইমরান খান। ১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বে পাকিস্তান ক্রিকেট বিশ্বকাপের শিরোপা অর্জন করে। পরবর্তীতে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে তিনি পিটিআই প্রতিষ্ঠা করেন।

 

আরও পড়ুন: যেভাবে গ্রেফতার হলেন ইমরান খান (ভিডিও)

 

সেনাবাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব

 

সোমবার প্রকাশ্যে ইমরান খানকে তিরস্কার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। যা দেশটির জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ডনের প্রধান খবর ছিল। গেল নভেম্বরে এক আত্মঘাতী হামলা থেকে বেঁচে যান ইমরান খান। একটি সমাবেশে প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে এক বন্দুকধারী। এতে তার ডান পায়ে তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়। ৭০ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদের কয়েকজন সমর্থকও তখন গুলিতে আহত হন।

 

তখন তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ইন্ধন রয়েছে এ হামলার পেছনে। যদিও এই অভিযোগের পেছনে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি ইমরান খান।

 

তার এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় ইমরান খান আবারও বলেন, এই আমাদের সেনাবাহিনী, এই আমাদের পাকিস্তান। আমার মিথ্যা বলার কোনো দরকার নেই।

 

সেনাবাহিনীর নিন্দা ও তিরস্কারের পরেও ইমরান খান দাবি করেন, গেল অক্টোবরে কেনিয়ায় পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক আরশাদ শরিফকে হত্যাকাণ্ডে ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) মেজর জেনারেল ফয়সাল নাসির দায়ী। এই অভিযোগও অস্বীকার করেছে সামরিক বাহিনী।

 

আরশাদ শরিফ সেনাবাহিনীর তুখোড় সমালোচক ছিলেন। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির উপকণ্ঠে তার গাড়িতে গুলি করে তাকে হত্যা করে পুলিশ। পরে অবশ্য এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে পুলিশ বলেছে, একটি শিশু অপহরণের ঘটনায় একই ধরনের একটি গাড়ি তল্লাশির কারণে ভুলবশত গুলি করা হয়েছে।

 

ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলতে বারণ করে ইমরান খানের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সেনাবাহিনী। বলেছে, আইএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ইমরান খান করেছেন, তা ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। কোনো প্রমাণ ছাড়া যেভাবে অভিযোগ করে যাচ্ছেন, তাতে তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন।

 

ইমরান খানকে গ্রেফতারের পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষের সরাসরি হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ফাওয়াদ চৌধুরী।

 

পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলেও সেনাবাহিনীর প্রভাব অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ৭৫ বছরের ইতিহাসের অর্ধেকেরও বেশি সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশটি শাসন করেছে সামরিক বাহিনী। সম্প্রতি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে না। 

 

No description available.
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ছবি: এএফপি

 

অর্থনৈতিক সংকট

 

আগামী অক্টোবরে দেশটির জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় দেশটির রাজনীতিতে এখন ভোটের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনী প্রচারের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থেকে সরিয়ে দিতে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করতে চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছিলেন ইমরান খান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রচারে ক্ষমতাসীন দল ও সেনাবাহিনী তাকে সমান সুযোগ দিচ্ছে না।

 

গেল মার্চে নিজ বাসভবনের বাইরে একটি সমাবেশে তিনি বলেন, আমি ক্ষমতায় যাচ্ছি বলে সরকার ভীত। কারণ তারা জানে যে আমি তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসব। কারাগারে পাঠালেও নির্বাচনে আমি জয়ী হবো।

 

রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ২০১৯ সালে নেয়া সাড়ে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি সচল করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চুক্তি করতে চাচ্ছে পাকিস্তান সরকার। কিছু শর্ত পূরণ করতে না-পারায় গেল নভেম্বর থেকে এই অর্থনৈতিক কর্মসূচি স্থবির হয়ে আছে। কিন্তু পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে উঠতে হলে এই ঋণ খুবই দরকার।

 

এছাড়াও ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কিস্তি ছাড় দিতে বেশ কিছু শর্তজুড়ে দিয়েছে আইএমএফ। যাতে রুপি বিনিময় হার আরও উদার করার পাশাপাশি কর বাড়াতেও বলা হয়েছে। এসব শর্ত মানতে পাকিস্তান সরকার কতটা সফল হবে; তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

 

রেটিং সংস্থা মুডি বলছে, আইএমএফের অর্থছাড় না পেলে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে পাকিস্তান। কারণ জুনের পরে এটির বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আর থাকবে কি না; তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

 

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি বলছে, গত গ্রীষ্মে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। তাতে সেখানকার এক তৃতীয়াংশ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বন্যায় দেশটির তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এতে প্রায় চার হাজার কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে পাকিস্তান।

 

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ক্রমাগত বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এক বছর আগের তুলনায় পাকিস্তানের ভোক্তামূল্য সূচক রেকর্ড পরিমাণ ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।

 

পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ফেব্রুয়ারিতে যেখানে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশ। মার্চে সেটিকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় খাদ্য, পানীয় ও পরিবহন খরচ বেড়েছে পঞ্চাশ শতাংশ। পাকিস্তানের প্রধান খাবার ময়দার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।

 

গ্যালাপ ও গিলানি পরিচালিত এক জরিপে দুই হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাদের তিন চতুর্থাংশ বলছে, গত ছয় মাসে পাকিস্তানের অর্থনীতির চরম অবনতি হয়েছে।

 

আরও পড়ুন: গ্রেফতারের আগে দেশবাসীকে যে বার্তা দেন ইমরান খান

 

গ্রেফতারে জনপ্রিয়তা বাড়বে ইমরানের

 

গ্রেফতার হওয়ার পর ক্রিকেট থেকে রাজনীতির মাঠে আসা ইমরান খানের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। পাকিস্তানের আইনজীবী আবদুল মইজ জাফরিও এমনটি মনে করছেন। ডন নিউজকে তিনি বলেন, এ গ্রেফতার ইমরান খানকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যাবে। এছাড়া আর কিছু হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার।

 

‘ক্ষমতাসীন সরকার ও তার অনির্বাচিত মিত্ররা মনে করেন, ইমরান খানকে পিটিআইয়ের বাইরে রাখতে পারলে তাদের ওপর থেকে চাপ কমে যাবে। তারা খুব সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারবেন। কারণ সরকারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন পিটিআইপ্রধান,’ বলেন এই আইনজীবী।

 

কিন্তু এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই জানিয়ে আবদুল মইজ আরও বলেন, আমি মনে করি, সরকার ভুলে গেছে যে ইমরান খান বছরখানেক ধরে যেসব দাবি করে আসছেন, তার পেছনে বৈধ কারণও আছে।

 

মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্কের খবর বলছে, ইমরানকে ঘিরে যে নাটক তৈরি হচ্ছে, তাতে তার জনপ্রিয়তার পালে নতুন টাটকা হাওয়া লাগবে। পাকিস্তানে হরহামেশা রাজনৈতিক নেতাদের কোণঠাসা করার চক্রান্ত করা হচ্ছে। কিন্তু সেই চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে ইমরান খানের।

 

রাজনৈতিক মাঠে তার অবস্থান এতটাই শক্তিশালী যে, নানা ষড়যন্ত্র করে সরকার ও সেনাবাহিনী তাকে আটকাতে পারবে না বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

 

গেল গ্রীষ্মে পাঞ্জাব ও করাচিতে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করে পিটিআই। সাধারণত পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে পাঞ্জাব প্রদেশ। বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণেই ক্ষমতাসীনদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ।

 

কেউ কেউ বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর প্রভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন ভোটাররা। রাজনীতিতে তারা সামরিক বাহিনীর প্রভাব দেখতে চায় না। আর ইমরান খানের জনপ্রিয়তার জোয়ার এতই বেশি যে, রাজনীতিবিদদের কোণঠাসা করতে পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী কলাকৌশল ইমরান খানের ক্ষেত্রে কার্যকর না-ও হতে পারে।

 

ধরপাকড় চলছে বহু আগ থেকেই

 

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই ইমরান খানের মিত্রদের ওপর ধরপাকড় শুরু হয়। এটি বছরখানেক আগের ঘটনা। তখন থেকেই যেসব সংবাদমাধ্যম ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তার পক্ষে সরব কিংবা সহানুভূতিশীল ছিলেন, ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের নীরব করিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আর তারা টেলিভিশন টকশোতে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। সাংবাদিকের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে, যাতে কেউ কথা বলতে না পারেন। ইমরান খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়।

 

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ইমরান খানের বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় এআরওয়াই নামের একটি মূলধারার চ্যানেল। কারণ এই চ্যানেলের এক টশোতে অংশ নিয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছিলেন ইমরানের এক সহযোগী।

 

এভাবে ইমরান খান ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে রাজনৈতিক শোডাউন চলছে। যার হারজিত দেখা যাবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে। অভিযোগ করা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ইমরান খান। তখন বিরোধীরা দাবি করেছিলেন, ইমরানের খানের বিজয় নিশ্চিত করতে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভীতিপ্রদর্শন ও বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী তখন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে।

 

কিন্তু এরপর হঠাৎ করে দাবার গুটি উল্টে যায়। গেল বছরের শুরুর দিকে ইমরান খানের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় সেনাবাহিনী। আইনপ্রণেতাদের অনাস্থাভোটে পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান।

 

এরপরেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন এই ক্রিকেট কিংবদন্তি, পাকিস্তানের রাজনীতিতে যা একেবারেই বিরল ঘটনা। কারণ, সেখানে সেনাবাহিনীর ভীতিকর প্রভাব রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুখখোলার ঘটনা পাকিস্তানে খুব একটা দেখা যায় না।

]]>