আদিম সমাজে মানুষের মধ্যে কোনো শ্রেণিভেদ ছিল না। মানবকুল তার অস্তিত্ব রক্ষার দুর্নিবার সংগ্রামে রত ছিল। গায়ে–গতরে বিরাজ করত জল-জঙ্গলের অগাধ গন্ধ আর প্রগাঢ় চিহ্নসকল। কপালে শোভা পেত জীবনসংশয়ে উদ্বিগ্ন গভীর চিন্তারেখা। ওই সমাজকে ইতিহাসে বলা হয় আদিম সাম্যবাদী সমাজ।
ক্রমে মানুষ সভ্য হয়েছে। প্রকৃতি ও চারপাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনেছে। বিয়েশাদি করতে শুরু করেছে। পরিবারপ্রথার পত্তন ঘটিয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা তৈরি হয়েছে। একপর্যায়ে মানুষ তৈরি করেছে গোত্র-সমাজ-রাষ্ট্রসহ বিচিত্র সব সংগঠন-সংস্থা-প্রতিষ্ঠান। এসবের ভেতর দিয়ে নাবালেগ মানবসম্প্রদায় বালেগ হয়েছে। এরই উপজাত হিসেবে আদিম সাম্যাবস্থা থেকে নানা অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক রূপান্তরের পথঘাট পেরিয়ে বর্তমানের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। মানবকুলে দেখা দিয়েছে বিচিত্র ভাগ-উপভাগ-বর্গ। এখন মানুষ বিভিন্ন রকম; ধনী-গরিব, সাদা-কালো, পূর্বি-পশ্চিমি, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-সাঁওতাল-ভিল-গারো; আরও হাজারে হাজার ফ্যাঁকড়া। আধুনিক যুগে মানুষকে যে বিচিত্র কিসিমে ভাগ করা হয় তারই এক কিসিমের নাম ‘মেহনতি মানুষ’। এই মানুষের প্রধান পরিচয় তারা মেহনত করে খায়।
কিন্তু একুশ শতকের পৃথিবীতে ‘মেহনতি মানুষ’ বললে শুধু পরিশ্রম করে খাওয়া মানুষকে বোঝায় না। এই নামবর্গের মধ্যে একটা ‘নিরীহ নিরীহ’ ব্যাপার আছে। আছে একটা ‘অবহেলা অবহেলা’ ব্যাপার। আর মেহনতি মানুষ বললেই পিলসুজের কথা মাথায় আসে, যে সভ্যতাকে আলোকিত করে নিজের গায়ে মেখে রাখে যত বর্জ্য আর কালিঝুলি।
কোনো কোনো তাত্ত্বিকের মতে ‘মেহনতি মানুষ’ একটি রাজনৈতিক বর্গ। কারণ, তারা একত্র হয়ে অনেক সময় অভাবিত সব কাণ্ডবাণ্ড ঘটিয়ে বসে। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের কথা বা এ রকম আরও নানা বিদ্রোহের কথা আমাদের জানা আছে। জানা আছে এসব ‘অঘটন’ নিয়ে রচিত নানা ইতিহাস ও সাহিত্যকর্মের কথা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই বর্গের মানুষেরা শিল্পসাহিত্যের চরিত্র, ইতিহাসের চরিত্র বটে; কিন্তু রচয়িতা খুব কমই। তাঁরা বর্ণিত ও চিত্রিত হন। বর্ণনা ও চিত্রিত করেন না।
আধুনিক বাংলা কবিতা উনিশ শতকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু কবিতায় মেহনতি মানুষের মুখ উঠে আসতে সময় লাগে প্রায় এক শ বছর। কারণ, উনিশ শতকে বাংলায় যে ‘রেনেসাঁস’ ও ‘আলোকায়ন’ ঘটেছিল, তা মূলত বর্ণহিন্দু ও জমিদার শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। তাঁদের শ্রেণিচেতন কলমে শ্রমজীবী মানুষ সংগত কারণেই দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া খুব একটা উঠে আসেনি।
কিন্তু বিশ শতকের গোড়ার দিকে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী এই শ্রেণিটি অনেকটা যেন দল বেঁধে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল বাংলাসহ সারা পৃথিবীর সাহিত্যকর্মের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায়। এই শ্রেণিকে নিয়ে রচিত হতে থাকল অসংখ্য কাব্য-কবিতা। বাংলা কবিতায় বিশেষ গুরুত্বসহকারে মেহনতি মানুষের মুখ দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত। সেটা বিশ শতকের বিশের দশকের কথা।




