
মাঠে বাইশ জন ফুটবলার দৌড়ান, গ্যালারিতে হাজারো মানুষ গান গায়, স্কোরবোর্ডে ওঠে গোলদাতার নাম। কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি পথ পাড়ি দেয় যে বস্তুটি, তার কোনো জার্সি নেই, কোনো জাতীয় সংগীত নেই, কোনো সংবাদ সম্মেলন নেই। সে শুধু ঘুরে বেড়ায় পা থেকে পায়ে, দেশ থেকে দেশে, স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে। সেই ছোট্ট গোলাকার বস্তুর নাম বল। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই বলের নাম Trionda।
প্রতিটি বিশ্বকাপের বল আসলে সময়ের একটি দলিল। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে টেলস্টার যেমন সাদা-কালো টেলিভিশনের পর্দায় স্পষ্টভাবে দেখা যাওয়ার কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছিল, তেমনি Trionda এসেছে ক্যামেরা, সেন্সর, ডেটা ও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির যুগে। এখন বল কেবল খেলোয়াড়ের পায়ের নির্দেশ মেনে চলে না, প্রয়োজন হলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সাক্ষ্যও দেয়।
নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ইংরেজি ‘Tri’ অর্থ তিন, স্প্যানিশ ‘Onda’ অর্থ ঢেউ। অর্থাৎ তিনটি ঢেউ। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র, তিন আয়োজক দেশের রং ও জাতীয় প্রতীক একসঙ্গে মিশেছে বলটির গায়ে। লাল অংশে কানাডার ম্যাপল লিফ, সবুজে মেক্সিকোর ঈগল, নীলে যুক্তরাষ্ট্রের তারকা। রঙের প্রবহমান রেখাগুলো এমনভাবে সাজানো, যেন স্থির অবস্থাতেও বলটি ঘুরছে। নকশাটি অনুপ্রাণিত হয়েছে স্টেডিয়ামের দর্শক-ঢেউ ‘লা ওলা’ থেকে। গ্যালারিতে মানুষ যখন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ক্রমান্বয়ে উঠে দাঁড়ায়, তখন যে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, Trionda তারই শিল্পিত রূপ।
তিন আয়োজক দেশের বাইরেও এই বলের জন্মকাহিনিতে আরও দেশ যুক্ত। Trionda তৈরি করেছে জার্মান প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস, কিন্তু এর উৎপাদন হয়েছে পাকিস্তানের শিয়ালকোটে, Forward Sports-এর কারখানায়।
Trionda ঠিক কতটি তৈরি হয়েছে, সেই সংখ্যা FIFA কিংবা অ্যাডিডাস প্রকাশ করেনি। তবে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের জন্য একাধিক বল প্রস্তুত রাখা হয়। তুলনা হিসেবে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ৩ হাজার ২৪০টি Brazuca ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ১০৪ হওয়ায় এবার Trionda-র ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই আরও বিস্তৃত হবে।
একেকটি Trionda তৈরিতে প্রকৃত খরচ কত, সেটি প্রকাশ করা হয়নি। তবে বাজারে থাকা Trionda Pro সংস্করণের দাম কানাডায় ২১০ কানাডিয়ান ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৭০ মার্কিন ডলার। এটি দেখতে ম্যাচ বলের কাছাকাছি হলেও বিশ্বকাপের মাঠে ব্যবহৃত সেন্সরযুক্ত টুর্নামেন্ট বল নয়।
Trionda তৈরি হয়েছে মাত্র চারটি বড় পলিউরেথেন প্যানেল দিয়ে। প্যানেলগুলো সেলাইয়ের বদলে তাপে জোড়া দেওয়া হয়েছে। বলের গায়ে রাখা খাঁজ, সংযোগরেখা ও সূক্ষ্ম উঁচু নকশা শুধু অলংকার নয়; এগুলো বাতাসে বলের স্থিতিশীলতা, ভেজা মাঠে গ্রিপ এবং শটের গতিপথ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
এর সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ চোখে দেখা যায় না। একটি প্যানেলের ভেতরে বসানো হয়েছে ৫০০ হার্টজের ইনর্শিয়াল মোশন সেন্সর। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের নড়াচড়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির কাছে পাঠাতে পারে। অফসাইড, সম্ভাব্য হ্যান্ডবল, ক্ষীণ স্পর্শ কিংবা গোললাইন সিদ্ধান্তে এই তথ্য কাজে লাগে। ১৪ জুন সুইডেন ও তিউনিসিয়ার ম্যাচে সেন্সর ডেটা একটি সূক্ষ্ম স্পর্শ শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিল। একসময় বল ছিল সিদ্ধান্তের বিষয়; এখন সেই বল নিজেই সিদ্ধান্তের সাক্ষ্য বহন করছে।
তবে প্রযুক্তি থাকলেই বিতর্ক থেমে যায় না। এবারের বিশ্বকাপে Trionda-র সেন্সর, VAR এবং সূক্ষ্ম স্পর্শ শনাক্তকরণ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ একে ফুটবলের ন্যায়বিচারের সহায়ক বলছেন, কেউ বলছেন প্রযুক্তি কখনও কখনও খেলার স্বাভাবিক প্রবাহকে অতিরিক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশ্বকাপের বল নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কখনও নকশা, কখনও গতি, কখনও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই ধারায় Trionda আলোচনায় এসেছে প্রযুক্তি, সেন্সর ও চার প্যানেলের নতুন নির্মাণরীতির কারণে। বল বদলেছে, খেলার বিজ্ঞান বদলেছে, কিন্তু বিশ্বকাপে বলকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল একই রয়ে গেছে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় বল বদলেছে, উপাদান বদলেছে, সেলাইয়ের জায়গা নিয়েছে তাপের বন্ধন, বলের ভেতর ঢুকেছে সেন্সর। কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি। পাড়ার মাঠে খালি পায়ে দৌড়ানো শিশুটি এবং বিশ্বকাপের ফাইনালে দাঁড়ানো তারকা, দুজনই শেষ পর্যন্ত একই গোলাকার বস্তুর পেছনে ছোটে। একজনের সামনে হয়তো বাঁশের গোলপোস্ট, অন্যজনের সামনে কোটি মানুষের চোখ; তবু দুজনের স্বপ্নের কেন্দ্রেই থাকে একটি বল।
তথ্যসূত্র: FIFA; adidas; Reuters; The Guardian






