মাদকের ছোবলে খুনের নেশা, শেষ কোথায়? | চ্যানেল আই অনলাইন

মাদকের ছোবলে খুনের নেশা, শেষ কোথায়? | চ্যানেল আই অনলাইন

মাদকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে হত্যা, মাদক ব্যবসার বিরোধে যুবককে কুপিয়ে হত্যা, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় প্রাণ গেল তরুণের সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উঠে আসছে মাদকের যোগসূত্র। কোথাও মাদক কেনার টাকা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, কোথাও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগাভাগি, আবার কোথাও মাদকসেবীদের আড্ডায় বাধা দেওয়াই হয়ে উঠছে হত্যার কারণ।

সর্বশেষ রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডের পর নতুন করে সামনে এসেছে মাদক ও সহিংসতার ভয়াবহ সম্পর্ক। পুলিশের এক পর্যায়ের বক্তব্যে বলা হয়েছে, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে পুলিশের তদন্তে হত্যার কারণ নিয়ে শুরুতে ডাকাতি এবং পরে মাদকের বিষয়টি সামনে আসায় ঘটনাটি ঘিরে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় মাদক ব্যবসার বিরোধে মাহিকে পুড়িয়ে হত্যা, ময়মনসিংহে মাদকের টাকা নিয়ে বিরোধে সুমন মিয়া হত্যা, গাজীপুরে মাদকের টাকা না দেওয়ায় স্ত্রীকে হত্যা, নোয়াখালীতে মাদকসেবনের প্রতিবাদ করায় স্কুলছাত্র আরাফাত হত্যা এবং কিশোরগঞ্জে মাদকসেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে যুবক হত্যার অভিযোগ।

চলতি বছর জুলাইয়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদক সেবনের টাকার জন্য স্ত্রী নাসিমা আক্তারকে হত্যার অভিযোগে ছায়েদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ছায়েদুল দীর্ঘদিন মাদকাসক্ত ছিলেন এবং এ নিয়ে পরিবারে অশান্তি চলছিল।

ঘটনার আগের দিন স্ত্রী বেতন পেয়ে বাড়ি ফেরার পর মাদক কেনার জন্য তার কাছে তিন হাজার টাকা চান ছায়েদুল। টাকা না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি স্ত্রীকে ছুরিকাঘাত করেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় সন্তানদের সামনেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে র‍্যাবের কাছে দেওয়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য থেকে জানা যায়।

ময়মনসিংহে ২৭ ফেব্রুয়ারি সুমন মিয়া নামে ৩৫ বছরের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ পরে মাদকের টাকা নিয়ে বিরোধকে হত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

তদন্তে পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার ১০–১৫ দিন আগে মাদকের টাকা নিয়ে সুমনের সঙ্গে আসামি সজীব আলীর হাতাহাতি হয়েছিল। পরে পরিকল্পনা করে সুমনকে ফোনে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে গাঁজা সেবনের সময় আবার টাকার বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি হলে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার দুজন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মে মাসে মাহি নামে এক ব্যক্তিকে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাহি ও অভিযুক্তদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

১৩ মে তাকে হাত-পা বেঁধে শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর ১৭ মে তার মৃত্যু হয়। পরে প্রধান অভিযুক্ত জহিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‍্যাব বলেছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জহির হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং ঘটনার নেপথ্যে ছিল মাদক ব্যবসা।

নোয়াখালীর সেনবাগে জুনে ১৫ বছরের স্কুলছাত্র আরাফাত হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনাতেও উঠে আসে মাদকের অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাফাতের নানাবাড়ির পাশে মাদক সেবনের আসর বসত। পরিবারের সদস্যরা সেখানে মাদকসেবন ও ব্যবসার প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে কথাকাটাকাটির জেরে হামলা হয়। আরাফাতসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করা হয় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরাফাতের মৃত্যু হয়।

অর্থাৎ এখানে মাদক সেবনকারী বা ব্যবসায়ীর সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থেকেও প্রতিবাদ করার কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে একজন কিশোরকে।

ফেব্রুয়ারিতে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে। স্বজনদের অভিযোগ, বাড়ির কাছে মাদকসেবনে বাধা দেওয়ায় ওই যুবকের ওপর হামলা করা হয়।

এই ঘটনাটি দেখায়, মাদক শুধু সেবনকারী বা কারবারিদের জীবনেই ঝুঁকি তৈরি করছে না; আশপাশের মানুষ প্রতিবাদ করলেও সংঘাত সহিংসতায় গড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে মাদক-সংশ্লিষ্ট হত্যার অন্তত চারটি ধরন স্পষ্ট হয়। প্রথমত, মাদকের টাকা। মাদক কেনার অর্থ না পাওয়া কিংবা অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বা অপরাধী চক্রের মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। এলাকা, ক্রেতা ও টাকার ভাগ নিয়ে অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব হত্যায় গড়াচ্ছে। তৃতীয়ত, মাদকসেবনে বাধা। বাড়ির আশপাশে বা নির্মাণাধীন ভবনে মাদকসেবনের প্রতিবাদ করাও কখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। চতুর্থত, মাদকের সঙ্গে অন্যান্য অপরাধের যোগসূত্র। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে মাদকের অর্থনীতি যুক্ত হয়ে সহিংসতার মাত্রা বাড়াচ্ছে।

২০২৪ সালের একটি ডিবি তদন্তেও ঢাকার পল্লবীতে ফয়সাল রাসেল হত্যার পেছনে মাদক ব্যবসা ও এলাকা নিয়ন্ত্রণের বিরোধকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

মাদক মামলার তদন্ত নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও একটি বড় দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। তদন্ত অনেক সময় শুধু ‘কার কাছে মাদক পাওয়া গেছে’—সেই পর্যায়ে আটকে থাকে; মাদক কোথা থেকে এসেছে, কার মাধ্যমে এসেছে, কীভাবে বাজারে ঢুকেছে এবং বিক্রির টাকা কার কাছে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি বলে আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তারা বলছেন, হত্যার ক্ষেত্রেও একই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একজন খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীকে গ্রেপ্তার করলেই মাদককেন্দ্রিক সহিংসতার মূল শিকড় কাটা যাবে না। প্রয়োজন মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, স্থানীয় সরবরাহকারী, প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধী চক্রের যোগাযোগ শনাক্ত করা।