স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফ উপকূলে নোঙর করা হান্টাভাইরাস আক্রান্ত ক্রুজ জাহাজ ‘এমএস হন্ডিয়াস’ থেকে যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
আজ রোববার (১০ মে) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া গোমেজ জানিয়েছেন, পুরো কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত জাহাজে থাকা সব যাত্রীই উপসর্গহীন রয়েছেন।
দূর থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, যাত্রীরা সাদা মেডিকেল মাস্ক পরে জাহাজের ডেকে হাঁটছেন ও অনেকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথম দফার সরিয়ে নেওয়ার সময় কয়েকজনকে ছোট নৌকায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। তীরে পৌঁছানোর পর সাদা সুরক্ষা পোশাক পরা কর্মকর্তারা তাদের গ্রহণ করেন।
যাত্রীদের জাতীয়তা অনুযায়ী ভাগ করে ধাপে ধাপে তীরে আনা হচ্ছে। এরপর বাসে করে স্থানীয় বিমানবন্দরে নেওয়া হচ্ছে, সেখান থেকে চার্টার বিমানে তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে।
বিমানবন্দরের ভিডিওতে দেখা গেছে, বিমানে ওঠার আগে যাত্রীদের পোশাকের ওপর সাদা হ্যাজম্যাট স্যুট পরিয়ে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ১৪ জন স্প্যানিশ নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর নেদারল্যান্ডসের ব্যবস্থাপনায় ডাচ, গ্রিক ও জার্মান যাত্রী এবং ক্রুদের একটি অংশকে নেওয়া হবে। পরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রগামী ফ্লাইট ছাড়বে। সর্বশেষ ফ্লাইট সোমবার অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
রোববার ভোরে ‘‘এমএস হন্ডিয়াস’’ জাহাজটি গ্রানাডিলা বন্দরের কাছে পৌঁছায়। প্রায় এক মাস আগে জাহাজে প্রথম যাত্রীর মৃত্যু হয়।
সূর্য ওঠার পর দেখা যায়, জাহাজটি উপকূল থেকে দূরে নোঙর করে আছে। চারদিকে সামরিক পুলিশ নৌযান টহল দিচ্ছে এবং শতাধিক যাত্রী ও ক্রুকে নামিয়ে আনার জন্য বড় ধরনের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে মেডিকেল টিম জাহাজে উঠে সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করে।
তবে জাহাজটিকে তীরে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। এর চারপাশে এক নটিক্যাল মাইলজুড়ে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
টেনেরিফের ক্যান্ডেলারিয়া হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়। সংক্রামক রোগ মোকাবিলার জন্য বিশেষ আইসোলেশন ইউনিটও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের প্রধান নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ মার মার্টিন বলেন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। এর আগে আমরা হান্টাভাইরাস দেখিনি, তবে এটি একটি ভাইরাস এবং প্রতিদিনের মতোই আমরা এর জটিলতা মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই বিরল ‘অ্যান্ডিজ’ ধরনের হ্যান্টাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর পুরো কার্যক্রমকে অভূতপূর্ব আখ্যায়িতক করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকি কম। অযথা আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য জনস্বাস্থ্য রক্ষার মূল নীতির পরিপন্থী।
স্প্যানিশ যাত্রীদের মাদ্রিদে নিয়ে গিয়ে সামরিক হাসপাতালে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে। তবে কতদিন তাদের আইসোলেশনে থাকতে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ এই ভাইরাসের সময়কাল সর্বোচ্চ নয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে।
দক্ষিণ আর্জেন্টিনার একটি ল্যান্ডফিল এলাকা থেকে ভাইরাসটির সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে ইঁদুরের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ বিরল হলেও এ পর্যন্ত তিনজন ক্রুজ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, জাহাজটি টেনেরিফেতে আনার সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মধ্যে কিছু উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। শুক্রবার একদল বন্দরকর্মী নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো ক্লাভিহো একপর্যায়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ভাইরাস বহনকারী কোনো ইঁদুর জাহাজ থেকে নেমে দ্বীপবাসীকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তবে স্পেনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, এমন আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি নেই।
টেনেরিফের রাজধানী সান্তা ক্রুজের বাসিন্দা জেনিফার নামের এক নারী বলেন, ভাইরাসটি অবশ্যই বিপজ্জনক। তবে সংক্রমণের জন্য খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ দরকার বলে শুনেছি। আমরা সতর্ক থাকলে আশা করি পরিস্থিতি খুব খারাপ হবে না।






