একটি তারিখ, দুই সিনেমা: ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর দুই রূপ | চ্যানেল আই অনলাইন

একটি তারিখ, দুই সিনেমা: ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর দুই রূপ | চ্যানেল আই অনলাইন

বাঙালির কাছে ‘বাইশে শ্রাবণ’ মানেই স্মরণ ও বিষাদের দিন। বাংলা বর্ষপঞ্জির শ্রাবণ মাসের ২২ তারিখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণদিবস। প্রতিবছর গান, কবিতা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই দিন স্মরণ করা হয় বাংলা সাহিত্যের এই মহীরুহকে।

তবে বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে ‘বাইশে শ্রাবণ’ শব্দটির আরও একটি বিশেষ অর্থ রয়েছে। প্রায় পাঁচ দশকের ব্যবধানে দুই নির্মাতা মৃণাল সেন ও সৃজিত মুখোপাধ্যায় এই ঐতিহাসিক তারিখকে নিজেদের সিনেমার নাম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সময়, গল্প ও নির্মাণশৈলীতে সিনেমা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও দুটির কেন্দ্রেই রয়েছে সংকটের সময় মানুষের মূল্যবোধ, সম্পর্ক ও মানবিকতার টানাপোড়েন।

মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে। অন্যদিকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ দর্শকের সামনে আসে ২০১১ সালে। একই নামের এই দুই সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে ভিন্ন কারণে।

দুর্ভিক্ষের অন্ধকারে ‘বাইশে শ্রাবণ’

১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে নির্মিত মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম হৃদয়বিদারক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। তবে দুর্ভিক্ষের বিশালতা বা মৃত্যুর সংখ্যা নয়, এই বিপর্যয় কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পর্ককে বদলে দেয়, সেটিই সিনেমার মূল বিষয়।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রিয়নাথ ও তার স্ত্রী মালতী। প্রিয়নাথ চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, আর মালতীর চরিত্রে মাধবী মুখোপাধ্যায়।

সিনেমার শুরুতে তাদের সংসারের স্বাভাবিক উষ্ণতা ও ভালোবাসার ছবি ফুটে ওঠে। কিন্তু ধীরে ধীরে গ্রামে নেমে আসে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা। মানুষ ঘর ছাড়তে শুরু করে, রান্নাঘরের আগুন নিভে যায়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে অনিশ্চয়তা ও ক্ষুধা।

ক্রমে ক্ষুধা মানুষের চিন্তা ও আচরণ বদলে দেয়। বেঁচে থাকার তাগিদে মানবিকতা, সহমর্মিতা এমনকি পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় প্রিয়নাথের একটি নির্মম স্বার্থপর সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতাকে আরও ভয়াবহভাবে সামনে আনে।

মৃণাল সেন যেন ‘বাইশে শ্রাবণ’ নামের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের সঙ্গে বাংলার আরেক অন্ধকার অধ্যায়ের মানবিক মূল্যবোধের মৃত্যুকেও যুক্ত করেছেন।

কবিতায় মোড়া খুনের রহস্য

প্রায় পাঁচ দশক পর একই তারিখকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে পর্দায় নিয়ে আসেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়। ২০১১ সালের ‘বাইশে শ্রাবণ’ মূলত একটি সিরিয়াল কিলিং তদন্তের গল্প। একের পর এক হত্যার পর ঘটনাস্থলে কবিতা রেখে যায় খুনি। সেই কবিতার সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নিতে থাকে পুলিশ।

তবে সিনেমাটি শুধু খুনের রহস্য উন্মোচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহিত্য, নিঃসঙ্গতা, অতীতের বোঝা এবং বদলে যাওয়া কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়- সবকিছুই গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে।

প্রবীর রায় চৌধুরী চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সিনেমার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার রুক্ষ আচরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীক্ষ্ণ তদন্তবুদ্ধি চরিত্রটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। তার সঙ্গে তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা অভিজিৎ পাকড়াশীর চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ও প্রশংসিত হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাংরি আন্দোলনের কবি নিবারুন চক্রবর্তী। এই চরিত্রে গৌতম ঘোষ সিনেমাটিতে অনন্য এক আবহ তৈরি করেন। বিস্মৃত এই কবির মধ্য দিয়ে সমাজের শিল্পী ও প্রচলিত ধারার বাইরে থাকা সৃষ্টিশীল মানুষদের প্রতি উদাসীনতার বিষয়টিও উঠে আসে।

একই নাম, দুই ভিন্ন অন্ধকার

দুটি সিনেমার গল্প একেবারেই আলাদা। একটি দুর্ভিক্ষের মধ্যে মানুষের মানবিকতার পতন দেখিয়েছে, অন্যটি কবিতার সূত্রে সিরিয়াল কিলিংয়ের রহস্য উন্মোচন করেছে। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে- সংকটের সময়ে মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে অনুসন্ধান।

মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ দেখিয়েছে ক্ষুধা কীভাবে মানুষের মূল্যবোধকে ধ্বংস করতে পারে। আর সৃজিতের ‘বাইশে শ্রাবণ’ দেখিয়েছে অপরাধের আড়ালেও মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাস, নিঃসঙ্গতা ও ক্ষত কতটা গভীর হতে পারে।

তাই ‘বাইশে শ্রাবণ’ শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণের একটি তারিখ নয়। বাংলা সিনেমার ইতিহাসেও এটি হয়ে উঠেছে দুটি ভিন্ন সময়ের, দুই ভিন্ন নির্মাতার এবং দুই ভিন্ন ধরনের মানবিক সংকটের প্রতীক। টেলিগ্রাফইন্ডিয়া