দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়, এর বৈশিষ্ট্য কী এবং বিশ্বের কোথায় এর উদাহরণ রয়েছে?
কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কী?
কল্যাণমুখী রাষ্ট্র এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা এবং সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো।
এ ধরনের রাষ্ট্রে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমাতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সম্পদ পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা থাকে। একই সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় নাগরিকদের সমান সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য
মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা: নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামাজিক নিরাপত্তা: বেকারত্ব, বার্ধক্য, অসুস্থতা বা শারীরিক অক্ষমতার মতো পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়। এর আওতায় বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো: কর ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ন্যায়বিচার ও অধিকার: নাগরিকদের আইনি, সামাজিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করা এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
কোন দেশগুলো এর উদাহরণ?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন মডেল রয়েছে। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো নর্ডিক দেশগুলো শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য পরিচিত।
এ ছাড়া জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশেও নাগরিকদের জন্য ব্যাপক সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু রয়েছে।
কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণার শুরু কীভাবে?
কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণা আধুনিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলেও এর ভিত্তি অনেক পুরোনো। তবে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকাশের মাধ্যমে এর আধুনিক কাঠামো তৈরি হয়।
বিসমার্কের হাত ধরে সামাজিক বীমার সূচনা
১৮৮০-এর দশকে জার্মানির চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক আধুনিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি তৈরি করেন। শ্রমিকদের অসন্তোষ কমানো এবং সমাজতন্ত্রের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তিনি বাধ্যতামূলক সামাজিক বীমা চালু করেন।
এর মধ্যে অসুস্থতা বীমা, দুর্ঘটনা বীমা এবং বার্ধক্যকালীন ভাতার ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকাশে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাজ্যে কল্যাণমূলক উদ্যোগ
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাজ্যেও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি শক্ত হতে থাকে। ১৯০৬ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে দেশটির লিবারেল সরকার বার্ধক্যকালীন পেনশন ও স্কুলে বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার মতো বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি চালু করে।
মহামন্দা ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ ডিল’
১৯৩০-এর দশকের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় যুক্তরাষ্ট্রেও রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তার ধারণা আরও বিস্তৃত হয়।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি বেকারদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা চালু করা হয়।
বেভারিজ রিপোর্টের ভূমিকা
আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নকশা হিসেবে ১৯৪২ সালের যুক্তরাজ্যের বেভারিজ রিপোর্টকে বিবেচনা করা হয়। অর্থনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা উইলিয়াম বেভারিজ এতে সমাজের পাঁচটি বড় সমস্যা চিহ্নিত করেন। এগুলো হলো অভাব, রোগ, অজ্ঞতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও কর্মহীনতা।
এই ধারণার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে দেশটিতে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) চালু হয় এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
কেন কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ?
কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ পায়, তা নিশ্চিত করা। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
তাই তারেক রহমানের ‘কল্যাণমুখী রাষ্ট্র’ গড়ার বক্তব্য মূলত এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে নাগরিকের মৌলিক চাহিদা, সামাজিক নিরাপত্তা, সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।


