বড় মিল দেখছেন এইচএসবিসির প্রধান অর্থনীতিবিদ

ছবি: সংগৃহীত
১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের আগে যে ধরনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান এশিয়ার আর্থিক পরিবেশে তার সঙ্গে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে বলে মনে করছেন এইচএসবিসির প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যান।
রোববার ৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি নিউজে এ তথ্য প্রকাশ করে।
তার মতে, ১৯৯৭ সালের মতো আর্থিক সংকটের ঝুঁকি এবার তুলনামূলক কম। বরং এশিয়ার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের চাহিদা কমে যাওয়া।
৩১ আগস্ট প্রকাশিত এক নোটে নিউম্যান বলেন, সংকটের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি, জাপানি ইয়েনের দুর্বলতা এবং প্রযুক্তি খাত নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ বাজারে বড় ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও এসব প্রবণতার সঙ্গে মিল দেখা যাচ্ছে।
নিউম্যানের মতে, ১৯৯৭ সালের সংকটের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের উচ্চ সুদহার এশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছিল। ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ৮ শতাংশে পৌঁছায়।
১৯৯৭ সালের এপ্রিলে এই সুদহার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ, যা চার বছর আগের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
বর্তমানে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ২০২০ সালের আগস্টের ০ দশমিক ৫ শতাংশের নিম্নস্তর থেকে বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে উঠেছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে যেখানে এটি ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখান থেকে এ বছরই প্রায় ৮০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে।
জাপানি ইয়েনের গতিবিধিতেও ১৯৯৭ সালের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রয়েছে বলে মনে করেন নিউম্যান।
১৯৯৫ সালের এপ্রিলে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর প্রায় ৮০-তে নেমে এসেছিল। দুই বছর পর ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে ১৩০-এ ওঠে, অর্থাৎ ইয়েনের মান প্রায় ৫৫ শতাংশ কমে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্রতি ডলারের বিপরীতে প্রায় ১০৩ ইয়েন থেকে ইয়েনের মান দুর্বল হয়ে গত জুলাইয়ে ১৬৩-তে পৌঁছেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিরল যৌথ হস্তক্ষেপে ইয়েন কিছুটা শক্তিশালী হয়। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর প্রায় ১৬০। বাজারে এখন আবারও জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য মুদ্রাবাজার হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে।
১৯৯৭ সালের সংকটের আগে ইন্টারনেটের উত্থানকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সময়ে সেই জায়গা নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ।
নিউম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এআই খাতের উত্থান এশিয়ার বেশ কয়েকটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে এআই-সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রনিক পণ্যের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে।
তবে ১৯৯৭ সালের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে।
নিউম্যান বলেন, ১৯৯০-এর দশকে এশিয়ার অধিকাংশ অর্থনীতি বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরশীল ছিল। অর্থাৎ তারা বিদেশ থেকে যতটা বিনিয়োগ পেত, বিদেশে তার চেয়ে কম বিনিয়োগ করত। দেশগুলোর নিজস্ব সঞ্চয়ও তাদের ব্যয়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
তখন ডলারে অর্থ সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দুর্বল ইয়েন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। এসব বিষয় এশিয়ায় আর্থিক চাপ বাড়ানোর অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
বর্তমানে চিত্রটি অনেকটাই ভিন্ন। এশিয়ার অনেক অর্থনীতি এখন বিদেশি পুঁজির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং নিজেরাই মূলধন রপ্তানি করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় বা দুর্বল ইয়েন আগের মতো বড় চাপ তৈরি করার কথা নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এশিয়া কোনো ঝুঁকিতে নেই।
নিউম্যানের মতে, এখন এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আর্থিক খাতে নয় বরং পণ্যের চাহিদার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এআই হার্ডওয়্যার খাতের ওপর এশিয়ার বেশ কয়েকটি অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
যদি যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার ও অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এআই হার্ডওয়্যার খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের পণ্যের চাহিদাও কমতে পারে।
নিউম্যানের ভাষায়, ১৯৯০-এর দশকে এশিয়ার ঝুঁকি ছিল আর্থিক দুর্বলতা। আর এখন সেই ঝুঁকি পরিণত হয়েছে ‘চাহিদাগত দুর্বলতায়’।
তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদহার বৃদ্ধি এআই খাতের উত্থানে চাপ তৈরি করলে অথবা ইয়েনের অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থায়ন বাজারকে অস্থিতিশীল করলে এশিয়ার পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। এর ফলে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
