মালাক্কায় নেমে সরু রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ক্রাইস্ট চার্চে পৌঁছালাম।
চার্চের লাল রংটা প্রথমেই চোখে পড়ে। সামনে পর্যটকদের ভিড় লেগেই আছে। ছবি তোলার হিড়িকও কম নয়। তবে দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে পার্থক্যটা টের পাওয়া যায়। বাইরের তুলনায় ভেতরটা অনেক সংযত। সারি সারি কাঠের বেঞ্চ। মাথার ওপর কারুকাজ করা কাঠের ছাদ। জানালা দিয়ে আসা আলো কাঠের গায়ে পড়ে একটা নরম আভা তৈরি করেছে। কোথাও উপাসনার জিনিসপত্র, কোথাও পুরোনো আসবাব। সব মিলিয়ে এমন একটা গাম্ভীর্য, যার সঙ্গে বাইরের কোলাহলের কোনো মিল নেই। ভেতরে এলে গির্জাটিকে শুধু ছবি তোলার পটভূমি থাকে না, হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ।
ডাচদের এই গির্জার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৭৫৩ সালে। পরে ব্রিটিশরা গির্জাটিকে অ্যাংলিকান উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহার করে। গির্জার বাইরের পরিচিত লাল রং শুরু থেকে ছিল না। ১৯১১ সালে ভবনটি লাল রঙে রাঙানো হয়। এত পরিবর্তনের পরও ভেতরের কাঠামো, উপাসনার পরিবেশে পুরোনো সময়ের চিহ্ন রয়ে গেছে। বাইরে দাঁড়ালে যে স্থাপত্যকে ঔপনিবেশিক মালাক্কার প্রতীক বলে মনে হয়, ভেতরে এসে তার সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্কটা অনুভব করা যায়।

ক্রাইস্ট চার্চের পাশেই স্ট্যাডথুয়স। একই লাল রঙের পরিসরে দাঁড়িয়ে থাকলেও স্থাপত্যটি ব্যবহার করা হতো প্রশাসনিক কাজে। ডাচ ভাষায় স্ট্যাডথুয়স শব্দের অর্থ ‘টাউন হল’। ১৬৫০ সালে নির্মিত এই ভবন ডাচ গভর্নরদের বাসভবন ও প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে এখানে ব্রিটিশ প্রশাসনেরও কাজ চলেছে।
পুরু দেয়াল, ভারী দরজা, জানালার পাল্লাও বেশ বড়। স্থাপত্যটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্থায়িত্বের কথা মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছিল। এত শতাব্দী পরেও এই স্থাপত্যের মধ্যে একধরনের কর্তৃত্বের ছাপ আছে।

স্ট্যাডথুয়স ছেড়ে আ ফামোসার দিকে এগোলে মালাক্কার রূপ খানিকটা বদলে যায়। এখানে লাল দেয়াল, জানালা আর ছাদের গোছানো স্থাপত্য নেই। আছে দুর্গের ভগ্নাবশেষ। পর্তুগিজরা মালাক্কা দখলের পর শহরটিকে সামরিকভাবে সুরক্ষিত করতে এই দুর্গ নির্মাণ করেছিল।
মালয় উপদ্বীপের এই বন্দর দিয়ে মালাক্কা প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নজর রাখা যেত। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যপথের সঙ্গে শহরটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ছিল। তাই দুর্গটি ছিল ‘সোনায়-সোহাগা’। বাণিজ্যিক সম্পদ পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতা ধরে রাখার একমাত্র উপায়।

এখন আ ফামোসার একটিমাত্র প্রবেশদ্বার টিকে আছে। নাম পোর্তা দে সান্তিয়াগো। দুর্গের যে অংশ একসময় বিস্তৃত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তার সামান্যই টিকে আছে।
পর্তুগিজ শাসনের পর ডাচরা মালাক্কার দখল নেয়। এদিকে ব্রিটিশ আমলের দুর্গের বড় একটা অংশ ভেঙে ফেলা হয়। তাই পোর্তা দে সান্তিয়াগোর সামনে দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত অসম্পূর্ণতার মুখোমুখি হতে হয়। দেয়াল নেই, প্রাচীর নেই, কামানের সারিও নেই। আছে পাথরের খিলান আর সময়ের রেখে যাওয়া ক্ষয়চিহ্ন। বিশাল সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি যে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি পাথরের কাঠামোয় এসে ঠেকে, আ ফামোসা তার দৃশ্যমান উদাহরণ।

সেন্ট পলস হিলের চূড়ায় এসে পর্যটকদের কোলাহল ধীরে ধীরে কিছুটা কমে গেল। গির্জার দেয়াল, পুরোনো রাস্তা, দূরে মালাক্কা নদীর জল আর ওপরে উঠে এল এমন এক সময়, যার সঙ্গে আমাদের পরিচয় কেবল ইতিহাসের বইয়ে।
১৫২১ সালে পর্তুগিজ অধিনায়ক দুআর্তে কোয়েলহো ছোট্ট চ্যাপেলটি বানিয়েছিলেন। সে সময় নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নোসা সেনহোরা দো ওইতেইরো’, মানে ‘লেডি অব দ্য হিল’। পর্তুগিজ শাসনের সময় থেকেই পাহাড়টি মালাকার ইউরোপীয় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ষোলো শতকে এখানে যাতায়াত করতেন সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার (১৫০৬-১৫৫২)। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ কিছুদিন এখানেই সমাহিত ছিল। পরে অবশ্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়।

ডাচরা মালাকা দখল করলে গির্জাটি তাদের হাতে চলে যায়। অন্যদিকে ক্রাইস্ট চার্চ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে সেন্ট পলস চার্চটির নাম বদলে গ্রেভইয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ব্রিটিশরা অবশ্য গির্জাটিকে বারুদ রাখার কাজে ব্যবহার করত।
প্রাচীন গির্জার ভেতরে এলে প্রথমেই চোখে পড়ে দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা সমাধিফলক। নাম, পদবি, মৃত্যুসাল লেখা আছে শিলালিপিতে।
জোহানেস, ইয়োহান ভান জিল, জেভিয়ারসহ একের পর এক সমাধিফলকে হাত রাখলাম। কোনো সাম্রাজ্যের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে নয়, কোনো ঔপনিবেশিক অতীতকে মহিমান্বিত করার জন্যও নয়। মানবিক সম্বোধন হিসেবে, যাঁরা তিন শ সত্তর বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।

পাথরের গায়ে হাত রেখে মনে হচ্ছিল, সময়েরও একটা শব্দ আছে। অস্পষ্ট, খুব মৃদু, প্রায় শোনা যায় না। তবু কান পাতলে বোঝা যায়, কেউ হেঁটে যাচ্ছে। বহু দূর থেকে, বহু শতাব্দী পেরিয়ে।
অদ্ভুত বিষণ্নতা নিয়ে পাহাড় থেকে নামলাম। মালাক্কা নদীতে কিছুক্ষণ রিভার ক্রুজ দেখলাম। মনটা একটু হালকা হলো।
বিকেল গড়িয়ে আসছিল বলে সিম্বে দা আমাদের ডাকলেন। শেষ বিকেলের নরম আলোয় মালাক্কার ভাসমান মসজিদটি দেখার ইচ্ছে ছিল। মালয় ভাষায় মসজিদটির নাম ‘মসজিদ সেলাত মেলাকা’। সমুদ্রের কাছে পৌঁছে সত্যিই চোখ আটকে গেল। সাদা স্থাপত্যের ওপর নীল-সোনালি গম্বুজ, পাশে উঁচু মিনার। যতদূর চোখ যায় অথই জল।

সূর্য তখন ডুবতে শুরু করেছে। আকাশের রং বদলাচ্ছে একটু একটু করে। সেই আলো এসে পড়ছে মসজিদের গায়ে। সাগরের জলেও ছড়িয়ে পড়েছে সন্ধ্যার রং। একদিকে সাগরের অসীম বিস্তার, অন্যদিকে প্রার্থনার জন্য তৈরি এই স্থাপনা। আহা, কী অপূর্ব!
মালাক্কার ভাসমান মসজিদটি খুব পুরোনো কোনো স্থাপনা নয়। ২০০৬ সালে উদ্বোধন করা হয়। তবে বয়স দিয়ে সব জায়গাকে মাপা যায় না। সূর্যাস্তের আলোয় সাগরের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত, নীরব মসজিদটিকে দেখে মনে হচ্ছিল রুমির কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘নীরবতাই পরম ভাষা, শব্দ কেবল তার অপূর্ণ অনুবাদ।’
ঘণ্টাখানেক বাদে ফিরে এলাম। সঙ্গে রয়ে গেল মসজিদের দৃশ্যটা।

রাতের খাবার খেতে গেলাম জঙ্কার স্ট্রিটে। দিনের আলোয় পুরোনো সব দোকানবাড়ি দেখেছি। সন্ধ্যার পর চারপাশে অন্য রকম ব্যস্ততা। ঝলমলে আলো, খাবারের স্টল, মানুষের ভিড়।
নাইট মার্কেটে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলো আর অতীতের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। দোকান বসেছে, ব্যবসা চলছে, মানুষ যাওয়া আসা করছে।

মালাক্কার দীর্ঘ বাণিজ্যিক জীবনের সঙ্গে এই রাস্তাটার সম্পর্কও যেন চোখের সামনে ধরা পড়ল। পুরোনো শহর অতীত সঙ্গে নিয়েই বর্তমানের ভেতরে বেঁচে আছে।
চলবে…
-
অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক




