মিরপুর মাজার: কেউ আসে মনের টানে, কেউ শুধু খাবার খেতে | সময় স্পেশাল

মিরপুর মাজার: কেউ আসে মনের টানে, কেউ শুধু খাবার খেতে | সময় স্পেশাল

<![CDATA[

রাজধানী শহর সংলগ্ন তুরাগ নদের কোল ঘেঁষে মিরপুরের শাহ আলী বাগদাদীর মাজারে প্রতিদিন শত শত মানুষের সেহরি ও ইফতারির ব্যবস্থা করা হয়।

পবিত্র রমজান উপলক্ষে মিরপুরের শাহ আলীর মাজার নতুনরূপে সাজানো হয়েছে। পুরো রমজানে মাজারে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে সেহরি ও ইফতারির।

 

মধ্যরাতে শাহ আলীর মাজারে সরেজমিন দেখা যায়, মাজার প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। এদের বেশির ভাগই সুবিধাবঞ্চিত ও সমাজের নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের লোক। মূলত এলাকা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা ঘরহীন মানুষের আশ্রয় এবং খাবারের জোগান দিয়ে থাকে এ মাজার।

 

No description available.
মিরপুর শাহী আলীর মাজারে গভীর রাতে সেহরির অপেক্ষায় ভক্ত-আগন্তুকরা। ছবি: আবু সাঈদ নিশান

   

এদের মধ্যে আবার অনেকেই আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের টানে বছরের পর বছর মাজারে পড়ে আছেন। তাদেরই একজন শারাফত আলী। সময় সংবাদকে তিনি বলেন, ‘আমি ১২ বছর ধরে মাজারে আছি। মনে হয় আল্লাহর ওলির কাছাকাছি আছি। এর আগে আরেক মাজারে বাবুর্চির কাজ করতাম। আমার ঘর-বাড়ি, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সব আছে। তবুও মাজারে থাকতে ভালো লাগে। এখন বয়স হয়েছে। জীবনের শেষ সময়টা মাজারেই কাটিয়ে দিতে চাই।’

আরও পড়ুন: পুরান ঢাকার সেহরি: যত গর্জে তত বর্ষে না

আরেকজন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার আবু তাহের। তিনি সময় সংবাদকে বলেন, ‘ছোটবেলায় আমার বাবা-মা মারা যান। এরপর থেকে মামার বাসায় থাকতাম। একদিন মামি আমাকে ইচ্ছেমতো মারধর করেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এই মাজারে চলে আসি। সেই থেকে এখানেই থাকি। এই মাজারই আমার ঘর, আমার শান্তি। মাজারে থাকা-খাওয়া নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। কেউ কিছু বলে না। রমজান মাসে প্রায় প্রতিদিন এখানেই সেহরি ও ইফতার করি।’

 

আবু তাহের ও শারাফত আলীর মতো অনেকেই মাজারকে বেছে নিয়েছেন নিজেদের বাসস্থান হিসেবে। মধ্যরাতে অনেকে আসেন নানা ধরনের মানত করতে, অনেকে আবার টাকা ও খাদ্যসামগ্রী দান করেন। যাদের দান করার সামর্থ্য নেই, তারা মসজিদে এসে নামাজ পড়েন। দুস্থরা খাবার খান, বিশেষ করে রমজানে তাদের ইফতার ও সেহরির বন্দোবস্ত মাজার থেকেই করা হয়।

 

No description available.
মিরপুর শাহী আলীর মাজারে গভীর রাতে প্লেটে খাবার সাজানো হচ্ছে। ছবি: সময় সংবাদ

 

এ ব্যাপারে মাজারের খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান মোহাম্মদ মিজান মিয়া সময় সংবাদকে বলেন, এবারের রমজানে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া সেহরির সময় কম করে হলেও ৫০০ মানুষের খাবারের বন্দোবস্ত করা হয়। এখানে যে কেউ এসে খাবার খেতে পারেন। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য খাবারের বন্দোবস্ত আছে এখানে।

আরও পড়ুন:  কুলীন কলরবে মুখরিত অভিজাত এলাকার এপিঠ-ওপিঠ
 

মাজারে খাবার দেয়ার ব্যাপারে কীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন–জানতে চাইলে মিজান বলেন, যখন খাবার দেয়ার সময় হয় তখন সাইরেন বাজানো হয়। সাইরেনের শব্দ শুনে নারী-পুরুষ আলাদা লাইনে দাঁড়ান। সেখানে তাদের কার্ড দেয়া হয়। কার্ড দেখিয়ে খাবার নিয়ে খাবার শেষে আবার কার্ড জমা দিয়ে যান। এতে খাবার সরবরাহে শৃঙ্খলার ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়।

 

No description available.
মিরপুর শাহী আলীর মাজারে সেহরির জন্য খাবারের প্লেট সাজিয়ে রেখেছে কর্তৃপক্ষ । ছবি: মহির মারুফ

 

মাজারের এক কনিষ্ঠ খাদেম ছোট মিজান সময় সংবাদকে বলেন, শুরুতে টাকার জন্য মাজারে চাকরি নিলেও এখন এখানকার মায়ায় পড়ে গেছি। চাইলেই অন্য কোথাও যেকোনো ধরনের কাজ করা সম্ভব। কিন্তু একধরনের মায়ার টানে মাজারে পড়ে আছি। এখানে অনেকেই এসে নামধাম কিছু না বলে টাকা দিয়ে যান। অনেকে আবার খাবার কিনে দিয়ে যান। কীসের টানে মানুষ এমন করে তারাই ভালো জানে।

 

মাজারে রমজানে সেহরি খেতে এসেছেন এমন কয়েকজন জানান, খিদা পেলে তারা রাতে মাজারে চলে আসেন। এখানে খাবারের কথা বললে ব্যবস্থা করা হয়। মধ্যরাতে মাজারে মাঝেমধ্যে আসর বসে। তবে ওরসের সময় মূলত মাজারে সাজ সাজ রব পড়ে যায়।

 

No description available.
মিরপুর শাহী আলীর মাজারে গভীর রাতে সেহরির অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ভক্ত-আগন্তুকরা। ছবি: সময় সংবাদ

 

এক সময় শাহ আলীর মাজারে নাচ-গানের নামে নানা ধরনের অনৈতিক কাজ হতো। বর্তমানে এসব বন্ধ জানিয়ে মাজারের কয়েকজন খাদেম বলেন, চার-পাঁচ বছর ধরে সব ধরনের নাচ-গান বন্ধ। মাজারে নামাজ ও ধর্মীয় কাজ ছাড়া আর কোনো ধরনের মজমা বসে না। মাঝেমধ্যে অনেক ইউটিউবার এসে মাজার নিয়ে নিজেদের মনগড়া ভিডিও বানায়। এতে মাজারের সম্মান ক্ষুণ্ন হয় বলে জানান তারা।

]]>